দেশে ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষতি কমিয়ে কৃষিকে আরও টেকসই ও আধুনিক করার লক্ষ্যে একটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আউয়াল। তার উদ্ভাবিত স্মার্ট আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিভাইসটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্রেইন গার্ড’।
এই ডিভাইসটি সংরক্ষিত ধানকে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। এটি উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির এমন শব্দতরঙ্গ তৈরি করে, যা মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে হলেও ধানের প্রধান শত্রু ‘রাইস উইভিল’-এর স্নায়ুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফলে পোকাগুলোর চলাচল, খাদ্য গ্রহণ ও প্রজনন ব্যাহত হয় এবং তারা ধীরে ধীরে শস্য থেকে সরে যায়। এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধবভাবে ধান সংরক্ষণ সম্ভব হয়।
প্রধান গবেষক ড. আব্দুল আউয়াল জানান, ২০২০ সালে ‘ডেভেলপমেন্ট অব স্মার্ট আল্ট্রাসনিক পেস্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ফর পোস্ট-হারভেস্ট লস রিডাকশন ইন স্টোরড প্যাডি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণা শুরু হয়। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক-এর সহায়তায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্রের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। তার নেতৃত্বে এবং সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. এহসানুল কবিরের অংশগ্রহণে একটি দল ডিভাইসটির নকশা, উন্নয়ন ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা সম্পন্ন করে।
তিনি জানান, কয়েক মাস আগেই যন্ত্রটির উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাতের অপেক্ষায় রয়েছে। ইতোমধ্যে এসিআই মোটরস লিমিটেড-সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ডিভাইসটি বাজারে আনতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ডিভাইসটির আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর কম খরচ। গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, উৎপাদন পর্যায়ে এটি খুবই স্বল্পমূল্যে তৈরি করা সম্ভব এবং বাজারে ছাড়ার পরও এর দাম দুই হাজার টাকার বেশি হবে না।
তবে বাজারজাতের ক্ষেত্রে নকল পণ্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি ইতোমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পেটেন্ট নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষার আবেদনও করেছেন। একই সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ হলে দেশে সংরক্ষিত ধানের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে এবং কৃষিখাতে টেকসই উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, দেশে সংরক্ষণকালীন সময়ে মোট ধানের প্রায় ৭ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়, যার প্রধান কারণ পোকামাকড়ের আক্রমণ। গবেষকদের মতে, ‘গ্রেইন গার্ড’ প্রযুক্তির মাধ্যমে মোট উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষতিও রোধ করা গেলে বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি বীজের অঙ্কুরোদগম হার বাড়লে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন বীজ সাশ্রয় হতে পারে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।