মে দিবস

যে হাত ইমারত তোলে, তাদের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নেই

মে দিবস। বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও সংগ্রামের দিন। কিন্তু বাংলাদের বাস্তবতায় মে দিবস ক্রমশ একটি প্রতীকী আচার হয়ে উঠছে, আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আটকা পড়ে ঐতিহাসিক তাৎপর্য হারাচ্ছে। দিবসটি ঘিরে মিছিল, ব্যানার, বক্তৃতা; অথচ যাদের জন্য এই আয়োজন, তাঁরা শুধু ব্যানারে। বাস্তবে সেই শ্রমিক রয়ে যায় অদৃশ্য অথবা অবহেলিত, পেছনের সারিতে।

রাষ্ট্র উন্নয়নের যে ঝলমলে বয়ান নির্মাণ করেছে- উঁচু সেতু, দ্রুতগামী মহাসড়ক, আকাশছোঁয়া ভবন। কিন্তু এই দৃশ্যপটের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অমানবিকতা। যে হাত ইমারত তোলে, সে হাতেরই নিজের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নেই। শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে আমরা যে নীরবতা পালন করি, তা কেবল উদাসীনতা নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক সহিংসতা। শহরের প্রান্তে, বস্তির সংকীর্ণ গলিতে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তারা বাস করে। একটি ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে থাকে একটি পরিবার, যেখানে আলো-বাতাস ঢোকে না, যেখানে পানির জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়, যেখানে স্যানিটেশন এক বিলাসিতা। এই জীবন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি পরিকল্পিত অবহেলার ফল। একজন শ্রমিক যখন সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম শেষে ঘরে ফেরে, তখন তার জন্য অপেক্ষা করে না কোনো প্রশান্তি; বরং আরও এক যুদ্ধ-বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করার সুবাদে প্রত্যক্ষ করেছি, শ্রমিকদের সন্তানেরা বড় হয় ধুলো, কোলাহল আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাদের জন্য নেই নিরাপদ খেলার মাঠ, নেই মানসম্মত শিক্ষা, নেই সুস্থ মানসিক বিকাশের পরিবেশ। শিশুরা শৈশব হারায় খুব অল্প বয়সেই; অনেকেই ঝরে পড়ে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে, কেউ কেউ আবার বাধ্য হয় শ্রমবাজারে ঢুকে পড়তে।

আমরা প্রায়ই বলি- শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। শ্রমিকরা কোম্পানি তথা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। কিন্তু এই বাক্যটি এখন একটি ক্লিশে, যদি সত্যিই তারা চালিকাশক্তি হতো? তবে তাদের জীবন এমন হতো না। তাদের ন্যূনতম মজুরি এমন হতো না, যা দিয়ে মাসের মাঝামাঝি পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে। বাজারদরের সঙ্গে তাদের আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। এক বড় ভাই মজা করে বলেন, “বেতন কম, কাজ বেশি-এমন পেশা হলে বুঝবে এটা মহান পেশা।”

কর্মক্ষেত্রও তাদের জন্য নিরাপদ নয়। দুর্ঘটনা এখানে ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে। অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, যন্ত্রপাতির ত্রুটি- সবকিছু মিলিয়ে শ্রমিকের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে। কিন্তু এসব ঘটনা আমাদের চেতনায় স্থায়ী দাগ কাটে না। কারণ, আমরা শিখে গেছি দ্রুত ভুলে যেতে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। যে গণমাধ্যমের কাজ ছিল প্রান্তিকের কণ্ঠস্বর হওয়া, সে আজ ক্ষমতার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে। শ্রমিকের জীবন সেখানে খবর নয়, বরং একটি ‘ইভেন্ট’। যখন বিপর্যয় ঘটে, তখন কিছুদিনের জন্য আলোচনায় আসে; তারপর আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। শ্রমিকদের নিয়ে ধারাবাহিক, গভীর, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রায় অনুপস্থিত। যেন তাদের জীবনের কোনো ধারাবাহিকতা নেই, কেবল বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি আছে।

রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোও এই বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছে। শ্রম আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। শ্রমিকরা প্রায়ই নিয়োগপত্র পায় না, সামাজিক নিরাপত্তা পায় না; বিচার পেতে গেলে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা আসলে একটি নীরব বার্তা-তোমাদের কষ্ট আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয় নয়।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-আমরা এই বাস্তবতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিচ্ছি। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি এমন একটি সমাজে, যেখানে একদল মানুষ সব সুবিধা ভোগ করে, আর অন্যদল মানুষ বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত থেকেও বঞ্চিত হয়। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বড় বিপদ।

মে দিবস তাই কেবল স্মরণ করার দিন নয়, এটি দাবি আদায়ের দিন। আমরা এমন এক রাষ্ট্র চাই, যেখানে শ্রমিকের সন্তান জন্ম নিবে বঞ্চনাহীন উত্তরাধিকার নিয়ে। আমরা এমন এক উন্নয়ন চাই, যেখানে শ্রমিকদের মজুরি অবিলম্বে পুনর্নির্ধারণ করা হবে, যাতে তা বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তাদের জন্য মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত হয়-যেখানে তারা মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারে। তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে, যাতে দারিদ্র্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংক্রমিত না হয়।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিকল্প নয়; এটি বাধ্যবাধকতা। প্রতিটি দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গণমাধ্যমকে তার আত্মা পুনরুদ্ধার করতে হবে। তাকে আবার সেই জায়গায় ফিরে যেতে হবে, যেখানে সত্য বলা একটি নৈতিক দায়িত্ব, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়। শ্রমিকদের জন্য আলাদা কাভারেজ, নিয়মিত প্রতিবেদন এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-এসব এখন সময়ের দাবি।

একটি সমাজের সভ্যতা নির্ধারিত হয়, সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। আমাদের শ্রমিকরা যদি এখনো অমানবিক জীবনে আবদ্ধ থাকে, তবে আমাদের উন্নয়ন আসলে একটি মুখোশ-যার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর বৈষম্য।

মে দিবসের প্রাক্কালে তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত-শ্রমিককে আর অদৃশ্য করে নয়। তার কণ্ঠকে প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে এনে সত্যকে স্বীকার করে পরিবর্তনের শুরু করা। আর সেই সত্য হলো-আমাদের উন্নয়ন এখনো অসম্পূর্ণ, যতদিন না শ্রমিক মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার পায়। যে সমাজ তার শ্রমিকের মর্যাদা দিতে পারে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের মর্যাদাও হারায়।

● সত্য সরকার, গণমাধ্যম ও উন্নয়নকর্মী


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বিসিবির অ্যাডহক কমিটি গঠন নিয়ে রিট

নিজ দেশে নিপীড়নের শঙ্কার কথা বললে ভিসা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র

যে হাত ইমারত তোলে, তাদের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নেই

মে মাসের মধ্যেই দেশে হাম নিয়ন্ত্রণে আসবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় হাওরে ‘অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন’

৬ বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টির আভাস, পাহাড়ে ভূমিধসের শঙ্কা

গিয়াস উদ্দিন সেলিমের পথের গল্পে ইয়াশ-বহ্নি, মুক্তি পাচ্ছে কবে

আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় আব্দুল মজিদ খান

অবিরাম বৃষ্টিতে ‍ডুবল নেত্রকোনায় হাওরের ধান

বিশ্বের ১০০ জন তরুণ নেতার মধ্য জাবির মুনিয়া, উপাচার্যের অভিনন্দন

১০

সরকার ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায় না: প্রধানমন্ত্রী

১১

রাজধানীতে কালি তৈরির কারখানায় আগুন

১২