গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর গ্রামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে আস্তানায় হামলা চালিয়ে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তিকে বেধড়ক পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ওই ব্যক্তির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তাতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু ভিডিওটি অনেক আগের। ওই ব্যক্তিকে পুলিশ উদ্ধার করলেও বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম ছিল। এ জন্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তাঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এমন ঘটনা তো ঘটছে। মানুষকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে হত্যা, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর কয়েক দফা ভাঙচুর, লাঞ্ছনা, গণমাধ্যমে আগুন দেওয়ার ঘটনা তো বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। শামীম রেজার হত্যা তো আলাদা কিছু নয়।
পুরো ঘটনা বিশ্লেষণে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারের বক্তেব্যে পাওয়া যায়। ১. সামাজিক মাধ্যমে থাকা পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ২. পুলিশের চেয়ে জনতা বেশি থাকায় রাষ্ট্র চেষ্টা করেও হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে পারেনি। মানে, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরে গিয়েও অনেক কিছু করা সম্ভব এবং আইনের যথেচ্ছা ব্যবহার চাইলেও সরকার তার লোকবল দিয়ে বন্ধ করার মতো অবস্থায় নেই।
বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যম এখন কেবল যোগাযোগ নয়; এটি রাজনীতি, অর্থনীতি, গণমত ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তারকারী একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু এই শক্তি দ্বিমুখী– একদিকে এটি নাগরিক অংশগ্রহণ ও তথ্যপ্রবাহ বাড়ায়; অন্যদিকে এটি বিভ্রান্তি ও উস্কানির উৎস। প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ: সামাজিক মাধ্যম কতটা বিপজ্জনক এবং উত্তরণের পথ কী?
ভুল তথ্য ও অপপ্রচার সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ঘৃণামূলক বক্তব্য বাস্তব জীবনে সহিংসতা সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক মেরূকরণ বাড়ায় এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এই সংকট কেবল বাংলাদেশের একার নয়; বিশ্বজুড়েই। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ২০২১ সালের ক্যাপিটল হিলে হামলা কিংবা ব্রাজিলে কংগ্রেসে আক্রমণের মতো ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্যের সঙ্গে যুক্ত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো, শিশু-কিশোরদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে কড়া নিয়ম চালু হয়েছে। এর বিপরীতে সরকারগুলোও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ বা আংশিক বন্ধ করার ঘটনা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে, যা দেখায় রাষ্ট্রগুলো সামাজিক মাধ্যমকে কতটা নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে– সামাজিকমাধ্যম ও প্রচলিত গণমাধ্যমের মধ্যে সরকার কাকে বেশি বিপজ্জনক মনে করে?
প্রচলিত সংবাদমাধ্যম যেমন টেলিভিশন, রেডিও ও পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও সমাজের তথ্যপ্রবাহের মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। এসব মাধ্যমে প্রকাশিত খবর সাধারণত সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে যাচাই-বাছাই এবং পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার চেষ্টা থাকে। ফলে সরকার চাইলে এ খাতকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে আইন, নীতিমালা, মালিকানা কাঠামো বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমকে সরকার তুলনামূলক ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে। অন্যদিকে সামাজিকমাধ্যম সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারীই কনটেন্ট নির্মাতা। লাখো মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে যায়– কোনো সম্পাদকীয় ফিল্টার ছাড়াই। এই ব্যবস্থা যেমন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ, বিপরীতে নতুন চ্যালেঞ্জও।
সামাজিকমাধ্যমে তথ্যের গতি এত বেশি যে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এখানে মতামতের বহুমুখিতা ও তীব্রতা বেশি। নাগরিক সরাসরি সরকারের সমালোচনা করতে, সংগঠিত হতে, এমনকি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পেছনে সামাজিকমাধ্যমের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সরকার স্বাভাবিকভাবেই এসব প্ল্যাটফর্মকে সম্ভাব্য ঝুঁকির উৎস হিসেবে দেখে।
আবার সামাজিকমাধ্যমে ‘মিসইনফরমেশন’ ও ‘ডিজইনফরমেশন’ বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুয়া খবর, বিকৃত তথ্য বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। নির্বাচন, জনস্বাস্থ্য বা নিরাপত্তা ইস্যুতে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। সরকারগুলো তাই অনেক সময় এ যুক্তি দেখিয়ে সামাজিকমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করে। একদিকে সামাজিকমাধ্যম মানুষের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং তথ্যের মানের অবনতিবিষয়ক বাস্তব সমস্যাও তৈরি করছে। ফলে বিষয়টি সাদা-কালো নয়, বরং ধূসর বাস্তবতা।
সংবাদমাধ্যমও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। যদি কোনো দেশে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, সেটিও জনমতকে একপেশে করে তুলতে পারে। তবে এটা ঠিক, বর্তমান সরকার সামাজিকমাধ্যম নিয়ে উদ্বেগ দেখছে। সররকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর কথায় এটা পরিষ্কার– ভুল ও অপতথ্য ছড়িয়ে যে কেবল সরকারকে বিব্রত বা বিপদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে, তা নয়; সমাজের মধ্যেও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়; সামাজিকমাধ্যম আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখছে।
শেষ করি, সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ নিয়ে। দীর্ঘ আলোচনায় মন্ত্রী জানালেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ইচ্ছা বর্তমান সরকারের নেই। বরং সংবাদমাধ্যম যেন ভয়ভীতিহীনভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে, সেটাই তারা চান। সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নতুন করে কোনো আইন করার কথাও ভাবছেন না। বরং যেসব বাধা গণমাধ্যমের সামনে আছে সেগুলো দূর করার উপায় নিয়ে তারা কাজ করতে চান। তবে সামাজিকমাধ্যম নিয়ে তাঁর উদ্বেগ স্পষ্ট।