প্রধানমন্ত্রীর সিনেমা দেখা ও দেশীয় চলচ্চিত্রের করুণ বাস্তবতা

সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা- একসময় এটি ছিল আমাদের যাপিত সাধারণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছুটির দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন, রঙিন পোস্টার আর হলের অন্ধকার ঘরে রুপালি পর্দার জাদুতে বুঁদ হওয়া ছিল এক স্বাভাবিক সামাজিক সংস্কৃতি। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে, প্রযুক্তির দাপটে আর নানা সংকটে সেই চিরচেনা দৃশ্যে ভাটা পড়েছে। ঠিক এমন এক প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি একটি দৃশ্য আমাদের সামাজিক ভাবনাকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে।

দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সাধারণ দর্শকের মতো টিকিট কেটে সিনেমা হলে গেছেন। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন মানুষের এই সাধারণ চলন নিছক বিনোদন নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। যখন রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতার বলয় ভেঙে জনপরিসরে উপস্থিত হন, তখন সেটি এক শক্তিশালী বার্তা দেয় যে, সংস্কৃতি এখনো আমাদের মিলনের প্রধান ক্ষেত্র।

তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তুমুল আলোচনা ও আবেগের বিচ্ছুরণ দেখা গেছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে আমাদের দীর্ঘদিনের কিছু অতৃপ্তি। আমরা এমন এক রাজনৈতিক বলয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যেখানে ক্ষমতা নিজেকে সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে পছন্দ করে। ফলে ক্ষমতার এই ‘সাধারণ’ হয়ে ওঠাই আমাদের কাছে এক ‘বিস্ময়কর’ ঘটনা হয়ে ধরা দেয়। আমাদের আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত এমন এক স্বাভাবিক রাষ্ট্রের, যেখানে একজন প্রধানমন্ত্রীর সিনেমা দেখা কোনো বড় সংবাদ হবে না, বরং সেটিই হবে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ।

ঘটনাটির আরেকটি দিক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে- তিনি কী ছবি দেখলেন? প্রথমে যখন শোনা গেল তিনি দেশীয় সিনেমা দেখেছেন, তখন আবেগের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। পরে যখন জানা গেল ছবিটি বিদেশি, তখন অনেকের মধ্যেই হতাশা তৈরি হলো। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, একজন দর্শক বা বাবা হিসেবে ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গায় তিনি কী দেখবেন, সেটি একান্তই তাঁর স্বাধীনতা। বিদেশে বড় হওয়া তাঁর কন্যার রুচি বা পছন্দ ভিন্ন হওয়াটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়।

তবুও জনপরিসরে যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত হন, তাঁর প্রতিটি কাজই একটি ‘প্রতীক’ তৈরি করে। তিনি যদি কোনো একটি বাংলা সিনেমা দেখতেন, তবে তা রুগ্ণপ্রায় দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে অনেক বড় এক অনুপ্রেরণা হতে পারত। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; কোনো নির্দিষ্ট সিনেমা বেছে নিলে তা ‘পক্ষপাতিত্বের’ বিতর্কেও পড়তে পারত।

আসল প্রশ্নটি আসলে অন্য জায়গায়। কেন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাতে পারছে না, যেখানে যে কোনো দর্শকের- সে প্রধানমন্ত্রী হোক বা সাধারণ নাগরিক- প্রথম পছন্দ হবে বাংলা সিনেমা? আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে মেধাবীদের অভাব নেই, কিন্তু আছে কাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশের অভাব।

একজন প্রধানমন্ত্রী যখন সিনেমা হলে যান, সেটি বড় কোনো বার্তা দেয় ঠিকই, কিন্তু তাতে চলচ্চিত্রের সংকট কাটে না। আমাদের প্রয়োজন এমন এক পরিবেশ, যেখানে সৃজনশীল কারিগররা নির্ভয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন। আমরা এমন এক দিনের অপেক্ষায় আছি, যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী সিনেমা হলে যাচ্ছেন কি না, সেটি খবরের শিরোনাম হবে না। বরং খবর হবে- দেশের চলচ্চিত্র বিশ্বজয়ের পথে হাঁটছে। যেদিন বিদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছেও বাংলা সিনেমাই হবে প্রথম পছন্দ, সেদিন আর আমাদের প্রশ্ন করতে হবে না-'তিনি কেন দেশি সিনেমা দেখলেন না?' সেদিন আমরা গর্ব করে বলতে পারব, তিনি যা-ই দেখছেন, তা আমাদেরই সৃষ্টি।

 

সত্য সরকার

গণমাধ্যম ও উন্নয়নকর্মী

 


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আজও খামেনির প্রতি সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা, প্রতিশোধের বার্তা ইরানের

এমবাপ্পের পেনাল্টিতে শেষ আটে ফ্রান্স, সামনে মরক্কো

জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের ন্যায়বিচার এদেশের মাটিতেই হবে : প্রধানমন্ত্রী

কৃষি-যোগাযোগ উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী

লাল পতাকায় পরিপূর্ণ খামেনির দাফন অনুষ্ঠান, কী বার্তা দিচ্ছে?

৫ আগষ্টের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের নয়: প্রধানমন্ত্রী

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সড়ক দুর্ঘটনায় ভ্যান চালকের মৃত্যু

জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

খামেনির শেষকৃত্যে বাংলাদেশের পক্ষে স্পিকারের শ্রদ্ধা

অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে ঠিকাদারদের টেন্ডার বাতিলের হুঁশিয়ারি

১০

আমরা ভালো মানুষ বলেই খামেনির দাফনের জন্য ৭ দিন ছুটি দিয়েছি: ট্রাম্প

১১

আলি খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

১২