ব্যক্তিগত কিংবা মিডিয়ার কাজের সুবাদে পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরেছি। কিন্তু এবারের ভ্রমণটা ছিল অন্যরকম। বিয়ের পর হানিমুনে গিয়েছি শ্রীলঙ্কায়। আমি এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি, কীভাবে একটা ভ্রমণ এতটা হৃদয়ের ভেতরে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ আমাদের জন্য শুধু কোথাও ঘুরে আসা ছিল না, এটা ছিল সময়ের ভেতরে হারিয়ে যাওয়ার এক ধরনের অভিজ্ঞতা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত নিজের মতো করে কথা বলেছে।
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সমুদ্রের কাছ থেকে, সেই নরম বালুর স্পর্শ আর ঢেউয়ের অনবরত শব্দ দিয়ে। শ্রীলঙ্কার গল শহরের গল ডাচ ফোর্টে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, ইতিহাস যেন এখনও শ্বাস নিচ্ছে। শত শত বছরের পুরোনো পাথরের দেয়াল, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য আর দূরের নীল সমুদ্র– সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত নীরব গল্প তৈরি করেছিল। সেখানে সন্ধ্যার আলোয় মোমবাতির মতো উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছিল, আর মনে হচ্ছিল, সময় যেন একটু ধীর হয়ে গেছে।
আমি হাঁটছিলাম সেই পুরোনো রাস্তাগুলোতে, যেখানে প্রতিটি মোড় যেন অতীতের কোনো স্মৃতি ধরে রেখেছে। সমুদ্রের বাতাস মুখে এসে লাগছিল, আর মনে হচ্ছিল এখানে এসে মানুষ নিজেকেই নতুন করে খুঁজে পায়। কখনও কখনও ভ্রমণ আমাদের অনেক দূরে নিয়ে যায় না; বরং নিজের ভেতরের খুব কাছাকাছি ফিরিয়ে আনে।
এরপর আমরা গেলাম মিরিসায়। সেই জায়গাটা একেবারেই অন্যরকম– খোলা আকাশ, বিস্তীর্ণ সমুদ্র আর এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য, যা শব্দে বোঝানো কঠিন। ভোরবেলা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, পৃথিবী এখনও খুব সুন্দর। নীল পানির মধ্যে নৌকাগুলো যেন ছোট ছোট গল্প হয়ে ভেসে চলেছে। ডলফিন দেখার কথা ছিল, কিন্তু তার থেকেও বেশি মনে রয়ে গেছে সমুদ্রের নীরবতা, আর সূর্যোদয়ের সেই কোমল আলো।
আমরা অনেকটা সময় গাড়িতে কাটিয়েছি– লম্বা পথ, পাহাড়, কুয়াশা আর হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি। জানালার বাইরে দৃশ্যগুলো বদলাচ্ছিল, আর ভেতরে চলছিল নীরব এক অনুভব। মাঝেমধ্যে কথা হচ্ছিল, মাঝেমধ্যে শুধু হাসি– আর অনেকটা সময় ছিল শুধু চুপচাপ দেখা।
এই ভ্রমণে কোনো কিছুই পরিকল্পনামতো হয়নি, তবুও সবকিছু ঠিকঠাক মনে হয়েছে। শ্রীলঙ্কা যেন আমাদের এক সঙ্গে সব অনুভূতি উপহার দিয়েছে– সমুদ্র, পাহাড়, বৃষ্টি, আলো।
ফিরে আসার পরও একটা অংশ সেখানে রয়ে গেছে। হয়তো সেটা সমুদ্রের শব্দে, হয়তো পুরোনো দুর্গের দেয়ালে, কিংবা মিরিসার ভোরের আলোয়। ভ্রমণ সবসময় আমাদের ফিরিয়ে আনে, কিন্তু কিছু কিছু জায়গা থেকে যায় ভেতরে– যেগুলো আর কখনও পুরোপুরি ছেড়ে আসা যায় না। এই যাত্রাটা আমাদের হানিমুন হিসেবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু শেষ হয়েছে অনেক বেশি কিছু হয়ে। ওই দূর- দূরান্তে, আমরা যেন একটু বেশি নিজেদের খুঁজে পেয়েছিলাম। দেশের বাইরে শুধু ঘুরতে ভালো লাগে তা নয়, দেশের মধ্যেও অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। যেখানে গেলে প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। তেমনই একটা জায়গা কক্সবাজার। বারবার সেখানে যেতে মন চায়।