অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের রপ্তানি বাড়াতে বড় প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তান। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা কাজে লাগাতে প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামাবাদ। আর এর অংশ হিসেবে দেশটির সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সে দুটি নতুন কারখানা চালু করা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ বলছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সের ওই কারখানা দুটিতে উৎপাদন শুরু হবে। শনিবার (২৯ আগস্ট) দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ওই স্থাপনা পরিদর্শনের পর সামরিক বাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে।
পাকিস্তানের ওয়াহ এলাকায় অবস্থিত পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিজ (পিওএফ) দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এই খাত থেকে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পরিদর্শনের সময় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিজের উৎপাদন সক্ষমতা, রপ্তানির সম্ভাবনা এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা পর্যালোচনা করেন।
সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন্স (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই সফরের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা খাতে স্বনির্ভরতা, দেশীয় উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে সামরিক বাহিনীর যে অঙ্গীকার রয়েছে তা স্পষ্ট হয়েছে।’
সংবাদমাধ্যম বলছে, সফরের সময় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা আসিম মুনিরকে নতুন দুটি কারখানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়। সামরিক বাহিনী বলেছে, দেশটির প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতাকে আরও আধুনিক ও দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর করার চলমান উদ্যোগের অংশ হিসেবে কারখানা দুটি স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেখানে কী ধরনের অস্ত্র বা সরঞ্জাম তৈরি হবে কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা কত—তা জানানো হয়নি।
দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে পাকিস্তানের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, গোলাবারুদ ও ড্রোন থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ বিমান ও যুদ্ধবিমান পর্যন্ত দেশীয়ভাবে তৈরি সামরিক সরঞ্জামের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছিল, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ১৩টি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে পাকিস্তান। এর মধ্যে ছয় থেকে আটটি দেশের সঙ্গে আলোচনা অনেকটা এগিয়ে গেছে। এসব আলোচনায় পাকিস্তান ও চীনের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান, পাকিস্তানে তৈরি ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাঁজোয়া যান বিক্রির বিষয় রয়েছে।
এদিকে শনিবারের এই সফরে আসিম মুনিরকে পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিজকে (পিওএফ) করপোরেট প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও জানানো হয়। চলতি বছর ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (ডিআইপিআরএ) প্রতিষ্ঠার পর এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাত পুনর্গঠন এবং এতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোই নতুন এই সংস্থার লক্ষ্য।
চলতি বছরের জুনে জারি করা ডিআইপিআরএ অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের একটি নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও বড় রপ্তানি খাতে পরিণত করার লক্ষ্যেই পাকিস্তান এই উদ্যোগ নিয়েছে।
সফরের সময় দেশীয়ভাবে নকশা ও তৈরি করা অস্ত্র ও গোলাবারুদের পরীক্ষা ও ব্যবহারিক মহড়াও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির প্রত্যক্ষ করেন বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানগুলো ওজনে তুলনামূলকভাবে হালকা এবং দিন-রাতে ও সব ঋতুতে হামলা চালাতে সক্ষম। অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমানটি পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) ও চীনের চেঙ্গদু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সামরিক পরিভাষায় জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানকে ‘মাল্টি-রোল ফাইটার জেট’ বলা হয়। অর্থাৎ, অনেক উঁচু থেকে হামলা চালানো, মাটির খুব কাছাকাছি নেমে বোমাবর্ষণ করা, প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমানের সঙ্গে আকাশে লড়াই (ডগফাইট), শত্রুর আকাশসীমায় ঢুকে বিপক্ষের ঘাঁটি এবং সমরসজ্জার নির্ভুল খবর নিয়ে আসা— এই সব কাজই করতে পারে অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমান।