রাজধানীর মান্ডায় পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় সৌদি প্রবাসী মোকাররমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামি হেলেনা বেগম আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। হেলেনার মেয়ে হালিমা আক্তার কিশোরী হওয়ায় তাকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
আজ (মঙ্গলবার) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুগদা থানার উপ-পরিদর্শক এনামুল হক মিঠু তাদের আদালতে হাজির করেন। হেলেনা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তা রেকর্ড এবং হালিমাকে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন আসামি হেলেনার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
আর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর বিচারক মো. মনিরুজ্জামানের আদালত হালিমাকে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক মারুফুজ্জামান এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
মোকাররম মিয়া নামে ৩৮ বছর বয়সী সেই নিহত ব্যক্তির বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের তালশহরে।
সোমবার বিকেলে র্যাব-৩ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যার রহস্য তুলে ধরে স্কোয়াড্রন লিডার মো. সাইদুর রহমান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সৌদি প্রবাসী মোকাররমের সঙ্গে একই গ্রামের বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী সুমনের সু-সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তারের সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলে কথাবার্তা বলতেন। প্রবাসে থাকার সময় মোকাররম তার পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ লাখের বেশি টাকা দেন
তিনি আরও জানান, গত ১৩ মে মোকাররম নিজ বাড়িতে না জানিয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং তাসলিমার সঙ্গে দেখা করতে তার বান্ধবী হেলেনার মুগদার মান্ডা এলাকার ভাড়া বাসায় আসেন। হেলেনা ওই বাসায় তার দুই মেয়েকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। রাতে তারা সবাই ওই বাসায় অবস্থান করেন।
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ১৩ তারিখ রাতে মোকাররম ও তাসলিমার মধ্যে বিয়ে নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়। মোকাররম বিয়ে করতে চাইলে তাসলিমা রাজি হন না। তখন তাসলিমাকে দেওয়া পাঁচ লক্ষাধিক টাকা ফেরত চান এবং মোবাইলে ধারণ করা তাসলিমার অসামাজিক কার্যকলাপের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হুমকি দেন। এই নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি একই রাতে মোকাররম হেলেনার মেজ মেয়ে হালিমার সঙ্গে অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করলে হেলেনা তা দেখে ফেলে। এই কারণে হেলেনার মধ্যেও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
তিনি জানান, বিরোধ ও ক্ষোভ থেকে তাসলিমা ও হেলেনা মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং পরদিন ১৪ মে সকালে নাস্তার সময় পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে মোকাররমকে খাওয়ায়। এতে মোকাররমের ঘুমের ঘোর এলে হেলেনা তাকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু মোকাররম জেগে যায় এবং হেলেনার হাতে কামড় দিয়ে ফেলে দিয়ে গলা চেপে ধরে। তখন তাসলিমা হাতুড়ি দিয়ে মারার চেষ্টা করলে মোকাররম সেটি কেড়ে নিয়ে উল্টো তাকে আঘাতের চেষ্টা করে। তখন হেলেনা পাশে থাকা বটি দিয়ে মোকাররমের গলায় কোপ দেয়। এতে মোকাররম মেঝেতে পড়ে গেলে হালিমা হাঁতুড়ি দিয়ে মোকারমের মাথায় আঘাত করে। হেলেনাও বটি দিয়ে কোপাতে থাকে। এতে মোকররম মারা যায়। পরে তার মরদেহ বাথরুমে নিয়ে ৮ খণ্ড করে পলিথিন ও বস্তায় ভরে সেখানে রেখে দেয় এবং তারা রক্তমাখা ঘর পরিষ্কার করে।
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, ওইদিন রাত সাড়ে ১১টার সময় সুযোগ বুঝে তারা নিহত মোকররমের মরদেহের ৭ টুকরো প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে বাসার নিচে ময়লার স্তুপে ফেলে দেয় এবং মাথার অংশ বাসা থেকে এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দিয়ে আসে। পরদিন তারা সবাই বাইরে ঘুরতে যায় এবং খাওয়া দাওয়া করে। রাতে বাসার ছাদে পার্টি করে এবং প্রতিবেশিদেরও ওই পার্টিতে দাওয়াত দেয়। পরদিন ১৬ মে তাসলিমা তার ছোট ছেলে আহনাফকে নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে চলে যায়। কিন্তু রোববার (১৭ মে) বাসার নিচের মরদেহ থেকে পচা গন্ধ ছড়ালে এলাকাবাসী পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে মর্গে পাঠায় এবং ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করে। পরে র্যাব গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে হেলেনা ও হালিমাকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহের মাথার অংশ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় মোকাররমের চাচা রফিকুল ইসলাম সোমবার মুগদা থানায় মামলা করেন।