জিআই স্বীকৃতি পেল ফরিদপুরের পাট, বিশ্ববাজারে সম্ভাবনা ...

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা, ১৫ জুলাই, ২০২৬  ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ‘ফরিদপুরের পাট’-এর স্বীকৃতি বাংলাদেশের পাটশিল্পকে বিশ্ববাজারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ।

তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তুর প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বাড়ার এ সময়ে জিআই স্বীকৃতি বাংলাদেশের পাটের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্র্যান্ডমূল্য বহুগুণ বাড়াবে।

কৃষি সচিব বলেন, পাট বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় ‘সোনালি আঁশ’ ছিল দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারের পরিবর্তন ও কৃত্রিম তন্তুর প্রসারের কারণে একসময় পাটের গুরুত্ব কিছুটা কমে গেলেও জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাড়তি চাহিদার কারণে আবারও পাটের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২৮২ ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। এর মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য এখনও দেশের রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ৮২০ দশমিক ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। বিশ্ববাজারে পাট খাতের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই বাংলাদেশের দখলে রয়েছে, যা দেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।

ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক ও পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্েযর জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। এ বাস্তবতায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, পরিবেশবান্ধব ও বায়োডিগ্রেডেবল তন্তু হিসেবে পাটের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি পাটের উৎপাদন, গবেষণা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বহুমুখী ব্যবহার সম্প্রসারণে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে সার, চিনি, ধান, চালসহ ১৭টি পণ্যের মোড়কে বাধ্যতামূলকভাবে পাটজাত মোড়ক ব্যবহারের আইন কার্যকর রয়েছে। একই সঙ্গে পাটচাষিদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও ভর্তুকি কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

কৃষি সচিব জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন কাঁচাপাট। উন্নতমানের এ পাটকে আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যকরভাবে ব্র্যান্ডিং করা গেলে দেশের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্রথম পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) উদ্যোগে ‘ফরিদপুরের পাট’-এর জিআই স্বীকৃতি অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটের স্বাতন্ত্র্য আরও সুসংহত হবে। একই সঙ্গে নকল বা ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষাও জোরদার হবে।

ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, জিআই স্বীকৃতি শুধু একটি সনদ নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক পরিচিতি। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঐতিহ্য, গুণগত মান ও উৎপাদন বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান, উদ্যোক্তারা নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান এবং স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পাটখাতের পুনরুজ্জীবনে বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জুটন কাপড় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য পাটের সুতা দিয়ে তৈরি স্কুলব্যাগ ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্পায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সচিব বলেন, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে প্রায় ২৫০ ধরনের বহুমুখী পাটপণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু রয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী পাটপণ্যের ওপর নগদ সহায়তা বৃদ্ধি এবং ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় ‘গ্রিন ইকোনমি’ বা সবুজ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উপাদান হতে পারে পাট। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পাট ও পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে কৃষি সচিব বলেন, শুধু পাট নয়, কৃষির সার্বিক উন্নয়নে নতুন প্রযুক্তি, জলবায়ু সহনশীল জাত, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিকীকরণ এবং জৈবপ্রযুক্তি গবেষণায় আরও জোর দিতে হবে।

তিনি বলেন, কৃষি গবেষণার ফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া গেলে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি বৃদ্ধি বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কৃষি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, কৃষক এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কালিম্বা: এক মায়াবী সুরের বাদ্যযন্ত্র

১

অপরাজিতা ফুল ও নীল চা: স্বাস্থ্যগুণ, উপকারিতা ও প্রস্তুতপ্রণালী

২

এই দিনে দেশ ছাড়েন এস কে সিনহা, কানাডা থেকে বললেন, ‘আমি ভাসমান’

৩

ডেঙ্গুতে আজ ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৫৪

৪

এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার পদে ‘পরিবর্তন আসছে’

৫

পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতি: সাবেক রাজউক চেয়ারম্যানসহ ৮ জনের ১৪ বছরের সাজা

৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

৭

জেল-রিমান্ড পেরিয়ে সাত মাস পর ফিরছেন জাহের আলভী

৮

২১ ঘণ্টা পরও ভবনে ধোঁয়া, ভেঙে পড়ছে কাঁচ

৯

দুর্যোগ প্রশমন দিবসে জুড়ীতে সচেতনতামূলক র‍্যালি ও মহড়া অনুষ্ঠিত

১০

নিউইয়র্কে বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে হেনস্তা, ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা সরকারের

১১

কাজী নজরুল ইসলাম: শৃঙ্খল ভাঙার গান ও এক অসাম্প্রদায়িক আধুনিকতার ইশতেহার

১২