পুরান ঢাকার চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ২১ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি নির্বাপণ সম্ভব হয়নি। এলাকাজুড়ে পোড়া গন্ধ ও ভবনটি থেকে উড়ে আসা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আশপাশের এলাকা। ভবনের ভেতরের তীব্র তাপে এখনো জানালার কাচ ভেঙে পড়ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বেলা দেড়টার দিকে অগ্নিকাণ্ডস্থল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানানো হলেও পুরোপুরি নির্বাপণ এখনো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ফলে আগুন নির্বাপণে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথাও জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এখনো আগুন নেভাতে কাজ করছেন। ভবনের নিচের দোকানিরা কেউ কেউ তাদের মালামাল সড়কে সরিয়ে নিচ্ছেন। এ ছাড়া মাঝেমধ্যেই ভবনের ওপরের তলার জানালার কাচ ভেঙে পড়তে দেখা গেছে।
এ কারণে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির সামনের সড়কের দুই পাশে ব্যারিকেড দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নির্বাপণে কাজ করছেন। একই সঙ্গে ওয়াসার পানিবাহী গাড়িতে করে পানি আনতেও দেখা গেছে।
এদিন সকালে চকবাজারের মনসুর খান প্লাজার সামনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলেন, চকবাজারের মনসুর খান প্লাজার আগুন বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে গোডাউনে থাকা মালামাল সরানো এবং আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কার্যক্রম চলছে। আগুনে ষষ্ঠতলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সপ্তম তলায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, গতকাল বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লালবাগ থেকে দুটি ইউনিট, সদর দপ্তর সিদ্দিকবাজার থেকে দুটি ইউনিট এবং পলাশী থেকে আরও দুটি ইউনিটসহ মোট ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপ। এর মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কৌশল প্রয়োগ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ষষ্ঠ তলায় থাকা গোডাউনগুলোতে শাটার ও তালা লাগানো ছিল। প্রতিটি গোডাউনে চার-পাঁচটি তালা ছিল। ভেতরের ক্রসফায়ার গেটেও তালা লাগানো ছিল। প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে এসব তালা কেটে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে।
ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ ছিল। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল যানজট। চকবাজারের রাস্তা অত্যন্ত সরু হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। বিশেষ করে, তখন ব্যস্ত সময় থাকায় যানজট বেশি ছিল।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা। ষষ্ঠ ও সপ্তম তলার ধোঁয়া বের হওয়ার পথ না থাকায় প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে ফায়ারফাইটারদের কাজ করতে হয়েছে। শাটারের তালা কেটে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।
পানির সংকটের কথা উল্লেখ করে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আশপাশে থাকা পানির রিজার্ভগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে পাম্প ও রিজার্ভার পরিবর্তন করে অন্য রিজার্ভার থেকে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি জানিয়ে তিনি বলেন, ভবনের ভেতরে এখন আর আগুন নেই। তবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল গোডাউনভর্তি থাকায় সেগুলো সরানো হচ্ছে এবং পানি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে মাঝে মাঝে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম এখনো চলমান। বিভিন্ন গোডাউন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
মালামাল সরানো না হলে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হবে না। কারণ, মালামালের নিচে থাকা তাপ ও ধোঁয়া থেকে আবার আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।
বর্তমানে আগুন নির্বাপণে ছয়টি ইউনিট কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, মালামাল সরানো ও পানি দেওয়ার কাজ চলছে। আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ না করে ফায়ার সার্ভিস চলে গেলে আবার আগুন জ্বলে উঠতে পারে।
কাজী নজমুজ্জামান বলেন, মনসুর খান প্লাজার ষষ্ঠতলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গোডাউন রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গোডাউনে আগুন লেগেছিল। এসব গোডাউনে ছাতা, কসমেটিকস, আতরের বোতল, আতরসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল ছিল। গোডাউনগুলো মালামালে পূর্ণ থাকায় সেগুলো সরিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সময় লাগছে।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, কত টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ বলতে পারবে। এটি নির্ধারণ করতে কিছুটা সময় লাগবে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম চলমান থাকায় এখনই এর কারণ বলা সম্ভব হচ্ছে না। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পর আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা কেউই আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। ভবনে বিদ্যুতের লাইন থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে তদন্তের পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।