ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৬২ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪৮ জন বিক্ষোভকারী ও ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে ইরানকে আবারও হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে অসন্তোষ থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২২ সালে তেহরানে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এটি।
ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে ইরানজুড়ে। জানা গেছে, দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে অসংখ্য মানুষ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন।
দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৬২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া হওয়া গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৮ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৪ জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
বিক্ষোভের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে সংকটে পড়েছে ইরানের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও। একজন চিকিৎসক বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, রোগীদের ভিড় সামলাতে তাদের পর্যাপ্ত সার্জন নেই। সংকটে পড়েছে চক্ষু হাসপাতালও।
যদিও দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বন্ধ থাকা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকায় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, চলমান আন্দোলনকে ‘বিদেশি-প্রণোদিত’ নাশকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের চাপে সরকার পিছু হটবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতেই আন্দোলনের নামে এই পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে ইরান। যেখানে বিক্ষোভকে ‘সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুর’-এ রূপান্তরিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান ‘বড় সমস্যায়’ পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ‘তোমরা গুলি শুরু না করাই ভালো। কারণ, আমরাও গুলি শুরু করব।’
এর আগে, ইরানে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর দেশটির সরকারকে সতর্ক করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিশোধ নেবে বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
আন্দোলনের শুরু যেভাবে
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং আগে থেকেই দেশটির বিভিন্ন খাতে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে দেশটির অর্থনীতি।
বছরজুড়েই ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক অবমূল্যায়ন এবং অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির কারণে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। এ প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকেই চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়।
ব্যবসায়ীদের আন্দোলন ক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়াতে শুরু করলে দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয় দেশটির সরকার। কিন্তু ততক্ষণে, দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি ছোট শহরে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন পর্যন্ত দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। যার ৬৭টি স্থানের ভিডিও যাচাই করেছে বিবিসি ভেরিফাই।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ ৪৮ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে পাঁচজন শিশু এবং আটজন নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও দুই হাজার ২৭৭ জন বিক্ষোভকারীকে।
৯ শিশুসহ কমপক্ষে ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে অন্তত ২২ জন নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করেছে বিবিসি পার্সিয়ান। যাদের অনেকেই লোরেস্তান এবং কুর্দি-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ইলাম ও কেরমানশাহ প্রদেশে নিহত হয়েছেন।
দেশটির কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহান, উত্তরের শহর বাবোলে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজেও বিক্ষোভ করেছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দেজফুলেও বিক্ষোভকারীদের বিশাল ভিড় দেখা গেছে।