মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ধারন করা প্রখ্যাত ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই। রোববার ভোরে দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। মৃত্যুর খবর তার পরিবার নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম।
রঘু রাইয়ের ছেলে আলোকচিত্রী নীতিন রাই জানান, দুই বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন তার বাবা। সন্ধ্যায় লোধি রোড শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়জুড়ে রঘু রাইয়ের কর্মজীবন বিস্তৃত। পেশাগত জীবনের শুরুটা ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে, কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি নিজের আসল পরিচয় খুঁজে পান আলোকচিত্রে।
মাত্র ২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের হাত ধরে ক্যামেরার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ধীরে ধীরে তিনি গড়ে তোলেন নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি, এবং সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠেন একজন খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক ও সম্পাদক। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে তিনি দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সমাজের বাস্তবতা এবং মানুষের জীবনসংগ্রামকে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন তাঁর ছবিতে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশি আলোকচিত্রীদের মধ্যে রঘু রাই ছিলেন অন্যতম। ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক ছিলেন তিনি। সীমান্তের শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে ঘুরে উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের মানবেতর জীবনসংগ্রাম তিনি ক্যামেরাবন্দী করেন।
শুধু সীমান্তেই থেমে থাকেননি, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি যুদ্ধের মুহূর্ত, বিজয়ের পর মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে ফেরা, এমনকি পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দৃশ্যও ধারণ করেন রঘু রাই।
তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদেরও। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা, শিবসেনা প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরে এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়—সবাই তাঁর লেন্সে ধরা দিয়েছেন ভিন্ন এক মাত্রায়। একইভাবে মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব মাদার তেরেসা-এর জীবন ও কাজও তিনি তুলে ধরেছেন গভীর সংবেদনশীলতায়।
আলোকচিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশে অর্জন করেছেন বহু সম্মাননা। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ধারণ করায় ১৯৭২ সালে তিনি ভারতের অন্যতম সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পদ্মশ্রী-তে ভূষিত হন।