, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। বিএনপি এ প্রস্তাবের একাংশে নোট অব ডিসেন্ট দেয়। দলটি রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা দিতে রাজি হয়নি। গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যে ৯টি সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, এর একটি এটি।
আলোচনা-সমালোচনায় রাষ্ট্রপতি
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোঃ সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টাদের শপথবাক্য পাঠ করান। এই ঘটনা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্ত। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তখন কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। যদিও শপথ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। এরপরই শুরু হয় আরও বড় বিতর্ক।
সাক্ষাৎকার ঘিরে বিতর্ক
২০২৪ সালের অক্টোবরে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নেই এবং তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি। এই বক্তব্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। কারণ, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে সেই বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় তখন।
সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতারা এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করেন। নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে, তাঁকে সরানো সম্ভব কিনা। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে সে সময় অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, রাজনৈতিক দাবি থাকলেও সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে সরানো সহজ নয়। ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
নতুন সংসদেও রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্ক
চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার সময় বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা, বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করে। এক পর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শেষ হয়নি; বরং নতুন সংসদেও তা ফিরে আসে।
সব সময় বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন মোঃ সাহাবুদ্দিন
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি তাদের সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই থেকেছেন এবং খুব কমই সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। মোঃ সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কিছু ঘটনা, সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো কার্যকলাপ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাঁর সাংবিধানিক ভূমিকা এবং পরে দেওয়া সাক্ষাৎকার– সব মিলিয়ে তিনি এমন এক রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন, যাঁকে ঘিরে বিতর্ক কখনোই পুরোপুরি থামেনি।
অপেক্ষার পরামর্শ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সরকার রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলেনি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বলেনি। তবে তিনি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অন্য মন্ত্রীদের সঙ্গে ‘কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা’ নিয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যদি রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত কারণে হোক, যে কোনো কারণে হোক পদত্যাগ করতে চান, সেই বিকল্প তো আছে। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। তিনি (রাষ্ট্রপতি) স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন কিনা, সেটি তাঁকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি যদি পদত্যাগ করতে চান, সাংবিধানিকভাবে সেটি স্পিকার বরাবর দিতে হয়। এটুকু নিয়ম আছে। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, গণমাধ্যমে একটি খবর এসেছে– তিনি (রাষ্ট্রপতি) লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, না। উনি চিকিৎসার্থে কিছুদিন আগে বিদেশে গিয়েছিলেন। লন্ডনে বসে তিনি (রাষ্ট্রপতি) শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেছিলেন– আরেক সাংবাদিকের এ প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেটি আমি জানি না। আমরা শুনিনি।’
পরে বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেন, শুক্রবার (আজ) পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।