দুবার গিয়েও টিকা মেলেনি, এখন সব আছে, নেই শুধু মালিহা

ছবি: সংগৃহীত।

ঘরের এক কোণে এখনও পড়ে আছে ছোট্ট হাতাওয়ালা গোলাপি রঙের জামাটি। বিছানার পাশে রাখা প্রিয় খেলনাগুলোতে জমেছে ধুলো। মাঝেমধ্যে মা সেগুলো হাতে নিয়ে বসে থাকেন। যেন একটু পরেই হামাগুড়ি দিয়ে এসে কোলে উঠবে তাঁর বুকের ধন। কিন্তু সে আর ফিরবে না। হামে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১১ মাস ১৭ দিনের জীবনে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছে মালিহা বিনতে মাহফুজ।

গত রোজার ঈদে বাবা-মায়ের সঙ্গে সাভারের আশুলিয়া থেকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালা ইউনিয়নের ভয়ানগর গ্রামে দাদার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল মালিহা। পরিবারের সবার আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সে। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেই হঠাৎ জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি আর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। চিকিৎসকরা জানান, শিশুটি হামের উপসর্গে আক্রান্ত, দ্রুত চিকিৎসা দরকার। 

স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়ে ঢাকায় ফিরে প্রথমে তাকে আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে দেখানো হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভর্তি করা হয় মিরপুর-২ এর এম আর খান শিশু হাসপাতালে। সেখানে পাঁচ-ছয় দিন চিকিৎসার পরও জ্বর না কমায় চিকিৎসকরা তাকে হাম ওয়ার্ডে পাঠান। তিন-চার দিন পর জ্বর কিছুটা কমে গেলে তাকে নিয়ে বাসায় ফিরেন মা-বাবা। কিন্তু দুই-তিন দিন পর আবার জ্বর আসে। তখন আবার হাসপাতালে ভর্তি করেন। 

পরে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হওয়ায় তাকে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এরপর হাসপাতালের বেড, অক্সিজেন এবং পিআইসিইউর সঙ্গে চার দিন লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানে ছোট্ট শরীরটি। গত ১২ এপ্রিল শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে।

মালিহার বাবা মাহফুজুর রহমান গাজীপুরের পোশাক কারখানা নিট এশিয়াতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী। পরিবার নিয়ে আশুলিয়াতে থাকতেন। মালিহার মা গৃহিণী। দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল তাদের ছোট্ট সুখের সংসার। বড় মেয়ে মুসকানের বয়স চার বছর। ছোট বোনকে হারিয়ে সে প্রায়ই মাকে প্রশ্ন করে, মালিহা কবে বাসায় আসবে মা?

এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না কেউ। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন মালিহার দাদা আব্দুস সালাম। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ঈদ করতে এসেছিল ওরা। কে জানত, এটাই হবে নাতনির শেষ আসা। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। উল্লাপাড়া থেকে ঢাকা– কোথাও বাদ রাখিনি। কিন্তু আল্লাহ তাকে আর রাখলেন না। বাড়ির সবাই ওকে নিয়ে পড়ে থাকত। এখন ঘরে ঢুকলেই শুধু শূন্যতা লাগে।

তিনি আরও বলেন, ভয়ানগরে এসে হামে আক্রান্ত হলো, আবার সেই ভয়ানগরের মাটিতেই তাকে কবর দিতে হলো। এই কষ্ট কোনো দিন ভুলতে পারব না।

স্বজনরা জানান, হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় মাঝেমধ্যে মালিহা চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকাত। সেই দৃষ্টি এখনও তাড়া করে ফেরে তার মাকে। শিশুটির মৃত্যুর পর থেকে পরিবারের কেউই স্বাভাবিক হতে পারেননি।

হামের টিকা নিয়ে আক্ষেপ করে মালিহার বাবা মাহফুজুর রহমান গতকাল সমকালকে বলেন, দুই মাস আগে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে আমি ও আমার স্ত্রী দুবার গিয়েও হামের টিকা দিতে পারিনি। তখন টিকা না থাকায় ফিরিয়ে দেন চিকিৎসকরা। ফলে আর টিকা দেওয়া হয়নি।

মেয়েকে হারানোর বেদনা যেন এখনও তাড়া করে ফিরছে এই বাবাকে। ভারী কণ্ঠে তিনি বলেন, মালিহার মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকত। সবার কোলে যেত, কোলে গেলেই মিষ্টি করে হাসত। সেই ভুবনভোলানো হাসিটা এখনও চোখের সামনে ভাসে। আমরা কেউই ওকে হারানোর কষ্ট মেনে নিতে পারছি না। আগামী কোরবানির ঈদে আবার উল্লাপাড়ায় গিয়ে মেয়ের কবর দেখে আসব। ওর মুখটা কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

দেয়ালে টাঙানো মালিহার ছবির দিকে তাকালেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা-বাবা। মাহফুজ বলেন, আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না সন্তানের অকালে চলে যাওয়া। ‌ওর মা সবসময় কেঁদেই চলেছে।‌ তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই।

সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমিন বলেন, জেলায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। শিশুটি উল্লাপাড়ার হলেও ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শিক্ষকদের ১৩ মে’র মধ্যে পাঠাতে হবে এমপিও ও উৎসব ভাতার বিল

‘ভণ্ড হুজুর’ বলে কাকে ইঙ্গিত করলেন মারিয়া মিম

শিক্ষা কারিকুলাম নতুন করে সাজানো সময়ের দাবি: প্রধানমন্ত্রী

হামের টিকার সংকট নিয়ে রাষ্ট্রীয়-আন্তর্জাতিক তদন্ত হবে

দুবার গিয়েও টিকা মেলেনি, এখন সব আছে, নেই শুধু মালিহা

ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির বাড়ি সাতক্ষীরায়

বায়ুদূষণের তালিকায় বিশ্বে প্রথম ঢাকা, বাতাস আজও ‘অস্বাস্থ্যকর’

মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন মির্জা আব্বাস আগের চেয়ে সুস্থ

ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে লিগ শিরোপা উদযাপন ইয়াম

গাইবান্ধায় কুকুরের কামড়ে তিনজনের মৃত্যু, এলাকায় আতঙ্ক

১০

ভিন্নমতের ঊর্ধ্বে পুলিশকে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

১১

পদত্যাগ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মোনামী

১২