সাইবার স্পেসে ট্যাগিং ও বুলিংয়ের ভয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ে মত প্রকাশ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন অনেক সাংবাদিক। ছবি: এআই
অনলাইনে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের মধ্যে অস্বস্তি ও আশঙ্কা বাড়ছে। সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতির আশঙ্কায় গত ছয় মাসে ২২ জন সাংবাদিকের মধ্যে ১৮ জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন। তাদের মধ্যে ১৩ জন বলেছেন, তারা প্রায়ই এমনটি করেছেন। ‘এক্সপ্রেশন পালস’ নামে সাংবাদিকদের ডিজিটাল স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণ উদ্যোগের রাউন্ড-১-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘এক্সপ্রেশন পালস’ হলো গবেষণামূলক ও তথ্যভিত্তিক কাজ করা বাংলাদেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডেটাফুল পরিচালিত একটি বিশেষ সমীক্ষা প্রতিবেদন। ডেটাফুল বলছে, গত ১০ থেকে ২৫ অগাস্ট পরিচালিত এই জরিপে গত ছয় মাসে সাংবাদিকদের ডিজিটাল মত প্রকাশের অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রশ্নভিত্তিক এই জরিপে অংশ নিয়েছেন ২২ জন সংবাদকর্মী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি বা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা সাংবাদিকদের অনলাইনে মত প্রকাশ সীমিত করতে পারে। কোনো সাংবাদিক সরাসরি আক্রান্ত না হলেও অন্য সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ দেখে তিনি কোনো পোস্ট প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কেউ রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে মন্তব্য করা বন্ধ করতে পারেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার পরিসর সীমিত করতে পারেন। এই কম দৃশ্যমান পরিবর্তনের সংকেতগুলোই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে ‘এক্সপ্রেশন পালস’ প্রতিবেদন।
মাত্র ২২ জন সাংবাদিকের ওপর পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল দিয়ে একটি দেশের সাংবাদিকদের সোশ্যাল মিডিয়ায় মত প্রকাশের প্রবণতা নিয়ে উপসংহারে পৌঁছানো যৌক্তিক কি না, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিষোদ্গার, গালিগালাজ, ট্যাগিং এবং হুমকির পরিমাণ যেভাবে বেড়েছে—বিশেষ করে সাংবাদিক কমিউনিটির ভেতরে যেভাবে বিভাজন বেড়েছে এবং যেভাবে তারা বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠির দ্বারা বুলিং ও ট্যাগিংয়ের শিকার হয়েছেন, তাতে এই ধরনের জরিপ দুই হাজার সাংবাদিকের ওপর পরিচালনা করলেও সম্ভবত একই ফলাফল আসবে।
শুধু সাংবাদিক নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় যেকোনো নাগরিকের কথা বলা বা মত প্রকাশ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক বলে মনে হয়। কেননা জুলাই অভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক বিভাজন এতটাই বেড়েছে যে, মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কও নির্ধারিত হচ্ছে তার রাজনৈতিক সমর্থন ও পক্ষপাতের দ্বারা। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দর্শন ছিল ইনক্লুসিভ সোসাইটি বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন।
তরুণরা এই আন্দোলনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকেই যুক্ত করতে পেরেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে রিকশাচালক—সকলেই রাজপথে স্লোগান দিয়েছেন। অনেক সাংবাদিক ও লেখক সরাসরি রাস্তায় নেমে মিছিল না করলেও বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে তারা এই আন্দোলনকে নানাভাবে সমর্থন দিয়েছেন। কেউ কেউ পরিস্থিতির চাপে কিংবা পেশাগত, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে চুপ থাকলেও তারা যে এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ছিলেন, তা নয়। বরং হাতে গোনা কিছু সাংবাদিক তৎকালীন সরকার ও সরকারি দলের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছেন—সেটি প্রথমত তাদের প্রতিষ্ঠানের মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থে, দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত সুবিধা প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতার কারণে। কিন্তু এই সংখ্যাটি খুব বেশি না হলেও গণহারে সবাইকে এক কাতারে নামিয়ে আনা এবং নিজের মতের বিরুদ্ধে কেউ কিছু লিখলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দোসর ট্যাগ দেওয়ার একটা ভয়ঙ্কর অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে—যা অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো দেড় বছর অব্যাহত ছিল এবং দুঃখজনকভাবে সেই প্রবণতা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া তথা সমাজ এখনও বের হয়ে আসতে পারেনি। যে কারণে অনেক সাংবাদিক এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক বিষয়ে কিছু লিখতে সংকোচ বোধ করেন। বিশেষ করে তারা গণতন্ত্রের স্বার্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা লিখলেও বা মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট লিখলেও সেটিকে অনেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার ছাঁচে ফেলে তাকে ব্র্যাকেটবন্দি করে ফেলেন। ফলে অনেকেই এখন আর এসব বিষয়ে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। বরং তার বিপরীতে ঝুঁকিহীন বিষয়ে লেখেন, পোস্ট দেন। পাখি-ফুল-লতা ও নদীর ছবি দেন। এমনকি রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বিষয়ে কারো পোস্টে মন্তব্য করা থেকেও অনেকে বিরত থাকেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার এই প্রবণতার বিপরীতে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে একটি গোষ্ঠি অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়েছে। নিজেদেরকে ‘জুলাইয়ের পক্ষশক্তি’ দাবি করে তাদের যা খুশি বলা ও লেখার স্বাধীনতা আছে বলে তারা মনে করে। যাকে খুশি তাকে ফ্যাসিস্টের দোসর, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’, ‘আগে কেন এসব বলেননি?’—ইত্যাদি ভাষায় আক্রমণ করেন। অথচ গভীর অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে ‘জুলাইয়ের পক্ষশক্তি’ দাবি করে যারা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় তৎপর, বিশেষ করে সাংবাদিকদের মধ্যে যারা দ্রুত রং বদলে ‘বিপ্লবী’ হয়ে উঠেছেন, তাদের অনেকেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে হয় নানাভাবে সুবিধাভোগী ছিলেন, না হয় ‘গুপ্ত’ রাজনীতির মতো নিজেদের প্রকৃত চেহারা আড়াল করে রেখেছেন—যারা এখন নিজেদেরকে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা অনুসারী প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। দুঃখজনকভাবে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা প্রকাশ্যেই বলেন বা লেখেন যে, তিনি অমুক দলকে ১৫ বছর সাপোর্ট দিয়েছেন। অথচ একজন সাংবাদিক যখন কোনো একটি দলের পক্ষে নিজেকে সমর্পণ করেন, তখন যে তিনি আর সাংবাদিক থাকেন না বা থাকতে পারেন না, সেই বোধটুকুও তাদের মধ্যে অনুপস্থিত।
মূলত সাংবাদিকদের মধ্যে এই শ্রেণির লোকেরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় খুবই তৎপর এবং তাদের আচরণের কারণেই অনেক সাংবাদিক সত্যিই সোশ্যাল মিডিয়ায় সমসাময়িক বিষয়ে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে অধিকতর সাবধান থাকেন, ভয়ে থাকেন। এই ভয় শারীরিক আক্রমণের নয়, বরং ট্যাগিংয
আমীন আল রশীদ
সাংবাদিক ও লেখক