’আমি জিতলে জিতে যায় মা’ ফ্রেশের এই বিজ্ঞাপনের মতো রাজনীতির অভিধানেও এর একটি বিশেষ সংস্করণ আছে। আমি জিতি, তুমিও জিতো, সমঝোতায় সবাই জিতি! ত্রয়োদশ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশজুড়ে যে রাজনৈতিক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে, তাকে আপাতত একটি বাক্যে বলা যায় ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’।
ত্রয়োদশ নির্বাচন যেন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক নাটকের শেষ অঙ্ক- যেখানে পর্দা নামার আগে দর্শক বুঝতেই পারে না, কে হবেন নায়ক আর খলনায়কই বা কে। ফলাফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মুখগুলো লক্ষ্য করলে মনে হয়- সবাই কমবেশি সন্তুষ্ট। কেউ অতি উল্লাসে, কেউ সংযত হাসিতে, কেউ কৌশলী নীরবতায়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, কেউই পুরোপুরি বিধ্বস্ত নয়। তাই প্রশ্নটা ঘুরেফিরে আসে- নির্বাচনে হারলো কে?
নির্বাচনের আগে আশঙ্কা ছিল অনেক। রাজনৈতিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, মাঠ দখলের শঙ্কা- সব মিলিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, বড় ধরনের সহিংসতা হয়নি, দেশজুড়ে স্থিতিশীল পরিবেশ ছিল। বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে ভোটগ্রহণ নিয়ন্ত্রিত ছিল। এমনকি সমালোচকরাও মানছেন অন্তত রাস্তাঘাটে রক্তের দাগ পড়েনি। এই রক্তপাতহীন নির্বাচনই এবারের প্রথম জয়। গণতন্ত্রের ইতিহাসে অনেক সময় ফলের চেয়ে প্রক্রিয়াটাই বড় হয়ে ওঠে। সেই দিক থেকে দেখলে, প্রক্রিয়া অন্তত ভেঙে পড়েনি।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অবস্থানে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অভিজ্ঞ ও ভোটের সমীকরণে জনপ্রিয় দল হিসেবে তারা এখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। স্থিতিশীল সংসদ তাদের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি চ্যালেঞ্জও। দলটি জানে ক্ষমতায় ওঠা যতটা কঠিন, টিকে থাকা তার চেয়েও কঠিন। তাই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তাদের কৌশল হবে ভারসাম্য রক্ষা। একদিকে দলীয় প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার- সবকিছুর সমন্বয় করতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী উল্লেখসংখ্যক আসন পেয়ে সাংগঠনিক শক্তির জানান দিয়েছে। সরাসরি সরকারে না গিয়ে প্রভাবশালী অবস্থানে, এটি একধরনের কৌশলগত সাফল্য। সরকারের অংশ না হয়েও সরকারে প্রভাব রাখা- রাজনীতির এই শিল্পটি সহজ নয়। তারা বুঝিয়েছে, বাইরে থেকেও ভেতরে থাকা সম্ভব! দলটি একদিকে নিজেদের আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখেছে, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতার বার্তাও দিয়েছে।
এই নির্বাচনের আরেক আলোচিত নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সীমিত আসন পেলেও জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। স্মার্ট পলিটিক্যাল প্লেসমেন্ট। নতুন দল হিসেবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার মতো একটি রাজনৈতিক স্পেস তৈরি হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ফ্যাক্ট যেটা বলছে যে, এটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভূক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে। তবে টিআইবি ৭০টি আসনে যেসব অনিয়ম দেখতে পেয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ঘটেছে ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া। টিআইবি বলছে, তাদের পর্যবেক্ষণ করা ৭০টি আসনের মধ্যে ৪৬.৪ শতাংশ আসনেই এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোটের এই হিসাব ও সরকারি ফলাফলের মধ্যে অমিলের কারণে কেউ বলছেন কারচুপি, কেউ বলছেন প্রশাসনিক বিভ্রান্তি। আবার কেউ ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বও হাজির করছেন।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, ফলাফল এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যাতে বড় তিন শক্তিই নিজ নিজ অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে। নেটিজেনরা বলছেন, প্রকাশ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা- অন্তরালে হয়তো সমঝোতা! এ প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে আপাতত সংঘাত এড়ানো গেছে? সেটাই বড় স্বস্তির সংবাদ।
রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি তারেক রহমান। তাঁর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভায় তরুণ ও প্রবীণের সমন্বয়ে- প্রজন্মের সেতুবন্ধনের ইঙ্গিত দেয়। এই মিশ্রণ একদিকে অভিজ্ঞতার ভার, অন্যদিকে তারুণ্যের গতি- দুইয়ের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টাও বটে। অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-কে ঘিরেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা কম নয়। তাঁর নামসহ বাকি উপদেষ্টাদের সঙ্গে সেফ এক্সিট শব্দবন্ধটি ঘুরছে। যা ইঙ্গিত দেয়, বিভিন্ন পক্ষই নিজেদের জন্য নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করেছে!
সবাই যেহেতু সেফজোনে তাহলে হারলো কে? সম্ভবত হারলো চরম সংঘাতের রাজনীতি। হারলো সেই আশঙ্কা, যেখানে নির্বাচন মানেই রক্তপাত। হারলো একপেশে আধিপত্যের ভয়। কেউ একচেটিয়া জেতেনি। ক্ষমতার পাল্লায় একধরনের ভারসাম্য এসেছে। এই ভারসাম্য পরিকল্পিত কি না- তা নিয়ে বিতর্ক থাকবে। তবে একটি কথা স্পষ্ট, উইন-উইন সিচুয়েশন যতই আকর্ষণীয় শোনাক, শেষ পর্যন্ত জনগণ যদি প্রত্যাশিত সেবা না পায়, তবে সেই জয় অর্থহীন। স্থিতিশীলতা, জবাবদিহি, কার্যকর সংসদ এটাই নাগরিকের চাওয়া। অন্ধ সমর্থন নয়, যুক্তিসংগত সমালোচনা হোক গণতন্ত্রের প্রাণ।
সত্য সরকার
গণমাধ্যম ও উন্নয়নকর্মী