কোথায় গেল পদ্মার সেই রুপালি ইলিশ

একসময় পদ্মার বুকে জাল ফেললেই উঠত রুপালি ইলিশের ঝাঁক। ভরা মৌসুমে নদীতে ব্যস্ততা বাড়ত জেলেদের, জমজমাট হয়ে উঠত নদীপাড়ের মাছের ঘাট। ইলিশ ধরেই চলত বহু পরিবারের সংসার। কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। পদ্মায় জাল ফেললেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না জেলেদের জালে। মাছ ধরতে সময় ও খরচ বাড়লেও কমেছে আয়। ফলে জীবিকার তাগিদে পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা।

পদ্মা ও যমুনাবেষ্টিত মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকা নদী দুটির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বিশেষ করে পদ্মার ইলিশ ছিল এখানকার জেলেদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কয়েক বছর ধরে নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় সেই নির্ভরতা এখন সংকটে রূপ নিয়েছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমে চর ও ডুবোচর সৃষ্টি, পানিদূষণ, ইলিশের খাদ্য কমে যাওয়া, মিঠাপানির প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত কারণে পদ্মায় ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জালে জাটকা ও মা ইলিশ ধরার কারণেও ইলিশের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’র ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পদ্মা নদীতে ইলিশের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মা নদীতে ইলিশ আহরণ হয় ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে হয় ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টন। পরের অর্থবছরে আবার কমে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টন হয়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বড় ধস নেমে আহরণ দাঁড়ায় মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন। শতকরা হিসাবে কমেছে ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম তিন অর্থবছরে ইলিশ আহরণে খুব বড় পরিবর্তন না থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে তা হঠাৎ অনেকটাই কমে গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়েছিল, এক বছরের ব্যবধানে তা কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।

পরিসংখ্যানের এই চিত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে নদীপাড়ের জেলেদের অভিজ্ঞতারও। তাদের ভাষ্য, আগের মতো ইলিশের দেখা না পাওয়ায় নদীতে মাছ ধরার ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক ব্যাপারী বলেন, আগে মাছ ধরেই সংসার চালাতাম। এখন নদীতে আগের মতো মাছ নেই। কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরতে হয়। শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

নদীর গভীরতা কমে যাওয়াকেও মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ মনে করেন এই জেলে। তার ভাষ্য, আমার মনে হয়, নদী আগের মতো গভীর নেই। এ কারণে মাছও আগের মতো আসে না। আমরা বুঝতে পারছি না, সেই আগের মাছগুলো গেল কোথায়?

ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লাও বললেন একই কথা। তার মতে, আগে নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছ নেই। নদীর গভীরতা কমে গেছে। জাহাজ চলাচলের শব্দেও মাছ ভয় পেতে পারে। এসব কারণেই নদীতে মাছ কমে গেছে বলে মনে হয়।

ইলিশ না পাওয়ার প্রভাব পড়েছে জেলেদের পেশাতেও। দড়িকান্দি গ্রামের কার্ডধারী জেলে লিটন সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। তিনি বলেন, নদীতে ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই নৌকা ও জাল বিক্রি করে একটি রিকশা কিনেছি। এখন রিকশা চালিয়েই সংসার চালাই।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও পরিযায়নেও প্রভাব পড়তে পারে। নদীর মোহনা ও প্রবাহপথে পলি জমে চর ও ডুবোচর সৃষ্টি হলে সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের প্রবেশের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ইলিশ সাধারণত ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে নদীতে আসে। এসময় পানির প্রবাহ, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও খাদ্যপ্রাপ্যতাসহ বিভিন্ন পরিবেশগত বিষয় তাদের বিচরণ ও প্রজননে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং নদীর পানির গুণগত মানের পরিবর্তন ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে নদীতে অপরিকল্পিত বর্জ্য ও দূষণ বাড়ায় জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি দিয়ে জাটকা ও মা ইলিশ ধরার ফলে ইলিশের প্রজনন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, প্রাকৃতিক বিভিন্ন কারণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব পড়তে পারে। ইলিশের খাদ্য কমে যাওয়া, নদীতে চর সৃষ্টি, জাহাজ চলাচল এবং নদীদূষণ- এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু মানুষ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি ব্যবহার করে মা ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ শিকার করছে। এতে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, নদীদূষণ, মানুষের অসচেতনতা এবং কিছু মৌসুমি জেলের নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ শিকারের পদ্মা-যমুনায় ইলিশ কমে গেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে ২৬২টি, মোবাইল কোর্ট করা হয়েছে ৭৫টি, ইলিশ মাছ জব্দ করা হয়েছে ৩ মেট্রিক টন, জাল জব্দ করা হয়েছে ২ লাখ ২৯ মিটার, নিয়মিত মামলা দেওয়া হয়েছে ১০৯টি। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৭০ জনকে ও জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২ লাখ টাকা।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিয়েতনামের ভিসা ব্যবস্থা সহজীকরণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

কারওয়ান বাজার থেকে কাঁচামালের আড়ত সরবে? বিকল্প ৩ বাজারের কী হাল?

সারাদেশে আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস

মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তার জন্য মাওলানা তারিক জামিলের দোয়া

নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: আইনমন্ত্রী

অডিও ভাইরাল : ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুলকে প্রত্যাহার

‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ নাটকের জাকিরের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, ভিডিও কলে থাকা নারী কে

চাটমোহরে হত্যা মামলায় নিরীহ মানুষকে হয়রানীর প্রতিবাদে মানববন্ধন

জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়নি কোনো কারখানা: বিজিএমইএ

ইমিগ্রেশনে মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক গ্রেপ্তার

১০

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

১১

ভারতে যাওয়ার পথে দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ খালেক গ্রেপ্তার

১২