‘মিশ্রণ’ শব্দটি হয়তো ‘ককটেল’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সবচেয়ে সার্থক নামকরণ। কেননা মানবসম্পর্ক যেমন নানা অনুভূতি, দ্বন্দ্ব ও আবেগের এক অনন্য মিশেলে গড়ে ওঠে, তেমনি প্রেম আর বন্ধুত্বের ‘ককটেল’ সিনেমাটিও যেন একাধিক স্বাদের সমন্বয়। ২০১২ সালে যখন প্রথম ‘ককটেল’ মুক্তি পায়, তখন এটি নিছক কোনো বিনোদনমূলক ছবি ছিল না; বরং ভারতীয় উপমহাদেশের তরুণ প্রজন্মের সম্পর্ক-চেতনার এক নতুন ব্যাখ্যা হয়ে উঠেছিল।
প্রেম, বন্ধুত্ব, আকর্ষণ, প্রত্যাখ্যানকে নির্মাতা এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে ছবিটি দেখে এক প্রজন্ম তাদের নিজেদের গল্প খুঁজে পেয়েছিল ভারোনিকা, মীরা ও গৌতমের ত্রিমাত্রিক চরিত্রে।
ঠিক ১৪ বছর পর সেই একই অনুভূতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে আসছে ‘ককটেল ২’। নতুন এই অধ্যায়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন শহিদ কাপুর, কৃতি শ্যানন ও রাশমিকা মান্দানা। আর আগের কিস্তির সাফল্যের সুবাদেই এবারও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন হোমি আদাজানিয়া। তবে বড় প্রশ্নটি রয়েই গেছে, পুরোনো ককটেলের সেই অম্লান স্বাদ কি নতুন প্রজন্মের কাছে ঠিক একইভাবে দিতে পারবেন, নাকি সময়ের বিবর্তনে তা পছন্দের তালিকা থেকে সরে যাবে?
প্রথম ককটেলে যেমন দীপিকা পাড়ুকোনের ‘ভারোনিকা’ ছিলেন স্বাধীনচেতা, খানিকটা উচ্ছৃঙ্খল, কিন্তু ভেতরে অত্যন্ত ভঙ্গুর এক নারী; অন্যদিকে ডায়ানা পেন্টি অভিনীত ‘মীরা’ ছিলেন সংস্কারে বাঁধা ও ধ্রুপদী নারী প্রতিমার প্রতিচ্ছবি। আর সাইফ আলী খানের ‘গৌতম’ ছিলেন এই দুই মেরুর মধ্যে দোদুল্যমান এক পুরুষ। এই দ্বৈততাই ছিল প্রথম সিনেমার প্রাণ। কিন্তু ‘ককটেল ২’-এর চরিত্ররা কি সেই একই দ্বৈততার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে?
ভারতীয় গণমাধ্যমে নির্মাতারা জানিয়েছেন, এটি কোনো ধারাবাহিক সিকুয়াল নয়; বরং সম্পূর্ণ নতুন গল্প, নতুন প্রেক্ষাপট ও নতুন মনস্তত্ত্ব নিয়ে হাজির হচ্ছে তারা। শহিদ, কৃতি ও রাশমিকা। তিনজন সম্পূর্ণ আলাদা মানসিকতার মানুষ।
গত কয়েক বছর অ্যাকশন ও থ্রিলার ঘরানার ছবিতে ব্যস্ত থাকার পর শহিদ কাপুর এই সিনেমার মাধ্যমে আবারও রোমান্টিক ড্রামার জগতে প্রত্যাবর্তন করছেন। তাঁর চরিত্রটি হতে পারে এক আধুনিক পুরুষ, যে সম্পর্কের গভীর সংজ্ঞা খুঁজে পেতে হিমশিম খায় এবং নিজের অস্থির মনকে কোনো এক নারীর মধ্যে স্থির করতে চায়। অন্যদিকে কৃতি শ্যানন, যিনি ‘বরেইলি কি বারফি’-তে পাশের বাড়ির সেই জেদি-মিষ্টি মেয়ে ‘বিটি মিশ্র’ হয়ে দর্শকের মন জয় করেছিলেন, তিনি ‘ককটেল ২’-তে কী ভূমিকায় অভিনয় করছেন, তা এখনও রহস্যেই আবৃত। তবে সিনেমার ট্রেলার আর টিজার দেখে আভাস মিলেছে, তাঁর চরিত্রটি হবে সমসাময়িক, আধুনিক কিন্তু গভীরভাবে আত্মপরিচয়ের সংকটে ভরা এক নারী; যে নিজের স্বাধীনতাকে ভালোবেসেও সমাজের চাপে বারবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে দক্ষিণী সিনেমার তারকা রাশমিকা মান্দানা বলিউডে ‘গুড নিউজ’ সিনেমার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েছেন। এই ছবিতে তিনি সেই চঞ্চল ও উদ্দাম চরিত্রটির প্রতিনিধিত্ব করবেন, যে সম্পর্কের আবর্তনে নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলে এবং ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল গুনতে থাকে। এই তিনটি আলাদা মাত্রার চরিত্র একসঙ্গে পর্দায় কেমন রসায়ন তৈরি করে, সেটাই এখন দর্শকের প্রধান কৌতূহলের বিষয়।
সম্প্রতি ভারতের সেন্সর বোর্ড ‘ককটেল ২’-কে ‘এ’ (প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য) সার্টিফিকেট দিয়েছে। বলিউডের অধিকাংশ রোমান্টিক ড্রামা সাধারণত ‘ইউ/এ’ ছাড়পত্র পেয়ে থাকে, যাতে পরিবারের সবাই মিলে তা দেখতে পারে। কিন্তু এই ‘এ’ সার্টিফিকেট সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ছবিতে সম্পর্কের উপস্থাপনা অনেকটাই খোলামেলা এবং প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের জন্য উপযোগী। প্রথম ককটেলেও কিছু প্রাপ্তবয়স্ক সংলাপ ও দৃশ্য ছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে আড়ালে ও মার্জিতভাবে। এবার হয়তো নির্মাতারা আরও সাহসী হয়েছেন, কারণ বর্তমান প্রজন্ম সম্পর্কের বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা ও মুক্তমনা। তারা কোনো ‘লেবেল’-এ বিশ্বাস করে না, বরং অনুভূতির গভীরতাকে গুরুত্ব দেয়। ‘ককটেল ২’ হয়তো সেই মানসিকতারই দর্পণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘এ’ সার্টিফিকেট কিন্তু একটি বড় ঝুঁকি। কারণ এটি পরিবারের সঙ্গে বসে সিনেমা দেখা দর্শক সংখ্যা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। কিন্তু নির্মাতা ও পরিবেশকরা যদি সঠিক টার্গেট অডিয়েন্সকে চিহ্নিত করতে পারেন, তাহলে এই ঝুঁকিই তাদের জন্য বড় পুঁজি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সংগীতের দিক থেকে প্রথম ‘ককটেল’-এর অ্যালবামটি ছিল কালজয়ী। ‘তুম হি হো বন্ধু’ আজও দেশের বিভিন্ন পাব, বার ও ডিস্কোতে সমান তালে বেজে ওঠে। ‘দারু দেশি’ ছিল পাঞ্জাবি ঝঙ্কারে ভরা এক উৎসবের সুর, আর ‘ইয়াদেঁ’ ছিল বিষাদময়। প্রীতম চক্রবর্তীর সংগীত প্রতিভা এতটাই দারুণ ছিল যে গানগুলো ছবির সাফল্যের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হয়ে উঠেছিল। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই প্রীতম এবারও সুর করেছেন ‘ককটেল ২’-এর জন্য। ফলে অ্যালবামটি নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তবে সময় বদলেছে, শ্রোতার রুচিও বদলেছে। এখন তারা রিমিক্স বা পুনর্নির্মাণের চেয়ে মৌলিক ও আন্তরিক গান বেশি পছন্দ করেন। নির্মাতারা হয়তো আধুনিক ইলেকট্রনিক বিটের সঙ্গে দেশীয় লোকসুরের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এটি কি প্রথম কিস্তির গানের মতো ‘চিরায়ত’ হয়ে থাকতে পারবে, নাকি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে?
বর্তমান সময়ে সম্পর্কের সংজ্ঞা অনেকখানি বদলে গেছে। সামাজিক মাধ্যম, ডেটিং অ্যাপস, তাৎক্ষণিক পছন্দ-অপছন্দ– এসবের মাঝে সম্পর্ক হয়ে উঠেছে অধিকতর জটিল ও নাজুক। প্রথম ‘ককটেল’ যখন মুক্তি পায়, তখন সামাজিক মাধ্যম এতটা প্রভাবশালী ছিল না; মানুষ তখনও রেস্তোরাঁয় বসে চোখাচোখি আর ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে প্রেম গড়ত। কিন্তু এখন তরুণ প্রজন্ম মূলত ভার্চুয়াল জগতেই সম্পর্কের সূচনা ও সমাপ্তি ঘটায়। ‘ককটেল ২’ যেহেতু সমসাময়িক প্রজন্মের গল্প বলছে, তাই এতে ডিজিটাল ডেটিং, ইনস্টাগ্রামনির্ভর সম্পর্ক, ব্রেকআপের পরবর্তী মানসিক প্রভাব এবং একাকিত্বের বিষণ্নতা– এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসতে পারে বলে মনে করছেন সিনেমাবোদ্ধারা। অনেকের মতে, যদি সম্পর্ক নিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক দিকগু