একদিকে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালি ঘিরে অবরোধ ও হামলার পরিস্থিতি, অন্যদিকে ইয়েমেনে ইরানসমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হাতে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ জোরদার—দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে ঘিরে নতুন করে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি যদি আরও অবনতির দিকে যায় এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে ইরানসমর্থিত হুতি গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনীর সংঘাতের কারণে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ পালিয়ে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশটির অর্থমন্ত্রী গত শনিবার এ তথ্য জানিয়েছেন।
হুতিরা বর্তমানে উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে রাজধানী সানা ও পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হোদেইদা। কয়েক দিনের মধ্যে উপকূলীয় এলাকাতেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে গোষ্ঠীটি। গত বৃহস্পতিবার বন্দর শহর মোখার নিয়ন্ত্রণও নেয় তারা।
লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা ও বেশ কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও হুতিদের হাতে রয়েছে বলে জানিয়েছে এএফপি। গত শুক্রবার বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে গোষ্ঠীটি।
বাব আল-মান্দেব হলো অ্যাডেন উপসাগর থেকে লোহিত সাগরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক পথ। এ নৌপথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, হুতিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এতে বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহের আরও প্রায় ৭ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিতে এর বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যখন এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তখন বাব আল-মান্দেবের সম্ভাব্য অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের সমন্বয়ক সাফিয়া ইব্রাহিম এএফপিকে জানিয়েছেন, নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ ইয়েমেন থেকে পালিয়ে জিবুতির ওবুক উপকূলে পৌঁছেছেন। আগামী দিনগুলোতে আরও মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের পর অন্তত ৭৬ হাজার মানুষ ইয়েমেনে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও দ্রুত বেড়েছে।
গত সপ্তাহে হুতি যোদ্ধারা সৌদি আরবসমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করে। এ সময় বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে হামলা চালানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানির বাজারে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
তবে একই সময়ে সৌদি আরবের হয়ে সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে জড়ানোও ওয়াশিংটনের জন্য সহজ নয়। কারণ, মার্কিন সামরিক বাহিনী এরই মধ্যে ইরানকে ঘিরে সামরিক তৎপরতায় ব্যস্ত এবং ওই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান ধরে রেখেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে হুতিদের দমনে সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করার অবস্থান জানিয়েছে। এর পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে তিনটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার ওমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ইরানের। সেখানে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এর মধ্যেই কেশম দ্বীপের কাছে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এতে একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তারা মার্কিন সন্ত্রাসী শত্রুদের দায়ী করেছেন।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একই সময়ে সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ায় উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শুধু তেলের দাম নয়, পণ্য পরিবহন ব্যয়, জাহাজ চলাচল, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবও যদি অচল হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি কতটা বড় ধাক্কা সামলাতে পারবে?