যে ৪ ধরনের উপহার দেয়া-নেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ

যে ৪ ধরনের উপহার দেয়া-নেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ

ইসলামি সমাজব্যবস্থায় উপহার আদান-প্রদান অত্যন্ত সুন্দর একটি রীতি। এর ফলে পারস্পারিক সৌহার্দ্য যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি এটি ক্ষোভ-বিদ্বেষ দূর করে। খোদ রাসুল (সা.) বলেছেন— তোমরা একজন অন্যজনকে উপহার দাও। উপহার মনের ময়লা দূর করে। এক নারী প্রতিবেশী অপর নারী প্রতিবেশীকে যদি বকরির (ছাগল) পায়ের এক টুকরা ক্ষুরও উপহার দেয়, তবুও যেন তা অবহেলা না করে। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ২১৩০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৬)
তবে ইসলামে উপহার আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম ও ইনসাফের সুস্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। সব ধরনের উপহার দেয়া-নেয়া যেমন ইসলামে জায়েজ নেই, তেমনি যেসব উপহারের নামে সুদ-ঘুষ বা কোনো অন্যায়ের লেনদেন হয়— সেসব ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
খোদ রাসুল (সা.)-ও হাদিয়া বা উপহার কবুল করতেন এবং অন্যদের উপহার দিতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে— রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া (উপহার) কবুল করতেন এবং তার প্রতিদানও দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৪) নিচে ইসলামে নিষিদ্ধ এমন ৪ ধরনের উপহার সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরা হলো:
আবু হুমায়দ সাঈদী (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে— একবার নবীজি (সা.) আযদ গোত্রের ইবনু উতবিয়া নামের একজনকে সাদকা সংগ্রহের কাজে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি ফিরে এসে বললেন— এগুলো আপনাদের (অর্থাৎ, সাদকার মাল), আর এগুলো আমাকে হাদিয়া (উপহার) দেয়া হয়েছে। পরে নবীজি (সা.) এ কথা শুনে রাগান্বিত হয়ে বলেন— সে তার বাবার ঘরে কিংবা তার মায়ের ঘরে কেন বসে থাকল না? তখন সে দেখত, তাকে কেউ হাদিয়া দেয়া কি না?
পরে রাসুল (সা) বলেন— যার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম, সাদকার মাল থেকে সামান্য পরিমাণও যে আত্মসাৎ করবে, সে তা কাঁধে করে কিয়ামতের দিন হাজির হবে। সেই মাল যদি উট হয়, তাহলে তা তার আওয়াজে, আর যদি গাভী হয়, তাহলে হাম্বা হাম্বা, আর বকরি হলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ রবে (আওয়াজ করতে থাকবে)। তারপর নবীজি (সা.) তার দু’হাত কিছুটা উত্তোলন করলেন যার ফলে তার উভয় বগলের শুভ্রতা প্রকাশ পেল। এরপর তিনি (নবীজি সা.) বারবার বললেন— হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি। হে আল্লাহ আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪২৫)
ইসলামে বরাবরই সৎ কাজে উৎসাহ দেয়া এবং অসৎ কাজে নিষেধের কথা এসেছে। এ ক্ষেত্রে কারও চাকরি, বিপদমুক্তি কিংবা কোনো বৈধ কাজে কারও জন্য সুপারিশ করা মহৎ কাজ। তবে এই উপকারের বিনিময় হিসেবে কোনো উপহার গ্রহণ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে ইসলামে কঠোর নিষেধ রয়েছে।
আবু উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— কোনো ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের জন্য কোনো বিষয়ে সুপারিশ করার কারণে যদি সে তাকে কিছু উপহার দেয় এবং সে (যে উপকার বা সুপারিশ করল) তা গ্রহণ করে, তাহলে সে সুদের একটি বড় দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৪১)
অর্থাৎ, ইসলামে কারও জন্য সুপারিশ করতে হলে নিঃস্বার্থভাবে সেটি করতে হবে। উপকারের পর উপহার নিলে ইসলামে সেটি সুদের মতোই পাপ হিসেবে গণ্য হবে। আর পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা এসেছে— আল্লাহ তায়ালা ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
বিপদ-আপদে কাউকে ঋণ দেয়া উত্তম কাজ। তবে কাউকে ঋণ দিয়ে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কারণ, ইসলামে এটিও সুদের অন্তর্ভুক্ত।
আবু বুরদা (রহ.) বলেন— একবার আমি মদিনায় গেলাম। পরে আবদুল্লাহ ইবনু সালামের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন— তুমি আমাদের এখানে আসবে না? তোমাকে আমি খেজুর ও ছাতু খেতে দেবো এবং একটি (মর্যাদাপূর্ণ) ঘরে থাকতে দেব। তারপর তিনি বললেন— তুমি এমন স্থানে (তৎকালীন ইরাক) বসবাস করো, যেখানে সুদের কারবার অত্যন্ত ব্যাপক। যখন কোনো মানুষের কাছে তোমার কোনো প্রাপ্য থাকে, আর সেই মানুষটি যদি তোমাকে কিছু ঘাস, খড় অথবা খড়ের ন্যায় নগণ্য বস্তুও হাদিয়া (উপহার) পেশ করে— তা গ্রহণ করো না, যেহেতু তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫৪২)
ইয়াহইয়া ইবনে আবু ইসহাক আল-হানাঈ (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন— তোমাদের কেউ কোনো জিনিস করয (ধার বা ঋণ) দেয়ার পর করযদার (ঋণগ্রহীতা) তাকে কিছু উপঢৌকন (উপহার) দিলে বা তার সওয়ারীতে (বাহন) আরোহণ করাতে চাইলে, সে যেন তাতে আরোহণ না করে এবং উপঢৌকন গ্রহণ না করে। তবে তাদের মধ্যে আগে থেকেই এমন সৌজন্যমূলক বিনিময়ের প্রচলন থাকলে সে ক্ষেত্রে আপত্তি নেই। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২৪৩২)
ইসলামে সন্তানদের বস্তুগত উপহারের পাশাপাশি ভালো আচরণ ও শিক্ষা দেওয়াকেও সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে দেখা হয়। খোদ রাসুল (সা.) বলেছেন— কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশি উত্তম কোনো জিনিস দিতে পারে না। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫২)
তবে বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখাও জরুরি। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এক সন্তানকে বেশি বা দামি উপহার দেয়া এবং অন্যদের বঞ্চিত করা ইসলামে ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
আমির (রহ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, তিনি নু’মান ইবনু বশীর (রা.) কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছেন যে— আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনত রাওয়াহা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাক্ষী রাখা ছাড়া (এ দানে) সম্মত নই। পরে তিনি রাসুল (সা.) কাছে হাজির হয়ে আরজ করলেন— আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। কিন্তু ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! সে আমাকে বলেছে— আপনাকে সাক্ষী রাখতে। এরপর তিনি (নবীজি সা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ ধরনের দান করেছ? জবাবে বশীর (রা) বললেন— না। পরে রাসুল (সা.) বললেন— তাহলে আল্লাহকে ভয় করো এবং আপন সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করো। এরপর বশীর (রা.) ফিরে এসে তার দান প্রত্যাহার করে নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৬)


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফিলিপাইনে দুই বিমানের ভয়াবহ সংঘর্ষ, ৪ পাইলট নিহত

১

ফিলিপাইনে দুই বিমানের ভয়াবহ সংঘর্ষ, ৪ পাইলট নিহত

২

প্রিন্সেস আস্তুরিয়াস পুরস্কার জিতে মেসির ইতিহাস

৩

শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বই, থাকছে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ

৪

যে ৪ ধরনের উপহার দেয়া-নেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ

৫

শীতের আগাম সবজিতে কমেছে দাম, তবু স্বস্তি নেই ক্রেতাদের

৬

ভ্যান গঘের দ্য স্টারি নাইট চিত্রকর্মের তারার রহস্য ভেদ

৭

গাজীপুরে গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৯ ইউনিট

৮

বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নৌযান চলাচলে সতর্কতা

৯

১১ বছর পর পেশাদার ফুটবলে ফিরছেন রোনালদিনহো

১০

মহা-রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে মোংলা বন্দর

১১

পিএইচপি দুর্বলতায় বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

১২