হাসপাতালেই ডেঙ্গুর আতঙ্ক, ময়লা-অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা

কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নার, কেবিন ও বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যেও রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত মশারির ব্যবস্থা। একইভাবে আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা হাম-রুবেলা কেন্দ্রেও বিরাজ করছে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, অব্যবস্থাপনার কারণে হাসপাতালেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সেখানে ১৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতাল থেকে ১২৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। পাশাপাশি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা হাম-রুবেলা কেন্দ্রে বর্তমানে ২০ জন রোগী উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছেন। চলতি মাসে এই কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৬৪ জন। 

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নার ও সাধারণ কেবিনের বারান্দায় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার উত্তরের ডেঙ্গু কেবিনের পশ্চিম পাশের বারান্দায় ময়লার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর পাশেই রোগী ও স্বজনদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। উত্তর ও দক্ষিণের দুটি ডেঙ্গু কেবিনের কোনো শয্যাতেই মশারি টানানো ছিল না।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় হুইলচেয়ার বা ট্রলি সময়মতো পাওয়া যায় না। পাশাপাশি একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন বা দর্শনার্থী ওয়ার্ডে প্রবেশ করায় সেখানে সার্বক্ষণিক ভিড় লেগেই থাকে।

একই করুণ দশা দেখা গেছে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের হাম-রুবেলা কেন্দ্রেও। সেখানেও অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি থাকা রোগীরা বেহাল অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সংক্রামক ব্যাধির এই কেন্দ্রে এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রোগীদের সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ করে তুলছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

এদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জেলার উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও এই দুই রোগের প্রকোপ বেড়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে ২৭ জন ডেঙ্গু রোগী এবং ১৪২ জন হাম-রুবেলা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসে উপজেলাগুলোতে আরও ৪৯৭ জন রোগী হাম-রুবেলার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ডেঙ্গু কর্নারগুলোর। কেবিনের ভেতরে ময়লা ও খাবারের উচ্ছিষ্ট পড়ে আছে। হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার উত্তরের ডেঙ্গু কেবিনের পশ্চিম পাশের বারান্দায় ময়লার ভাগাড় তৈরি হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণের দুটি ডেঙ্গু কেবিনের কোনো বিছানায় মশারি টানানো হয়নি। সেখানে ময়লার ভাগাড়ের পাশেই রোগী ও স্বজনদের বসে থাকতে দেখা গেছে।

শহরের খলিলগঞ্জ এলাকার খেজুরতলা এলাকার এক রোগীর স্বজন তানজিনা বলেন, আমরা রোগীকে ভর্তি করার সময় কোনো হুইলচেয়ার বা ট্রলি পাইনি। সিস্টার-ব্রাদারকে অনুরোধ করেও কোনো লাভ হয়নি। রোগীকে অনেক কষ্ট করে ওপরে তোলা হয়েছে।

হাসপাতালের পূর্বের পুরোনো অংশে অবস্থিত হাম-রুবেলা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের ৩ বছর বয়সী রোগী মোরসালিনের চাচা সাজেদুল মিয়া বলেন, দুপুরে রোগীকে ভর্তি করা হয়েছে। এখনো ডাক্তার দেখেনি। নার্সরা দেখভাল করছেন। সব ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এখানকার পরিবেশ নোংরা, বাথরুমগুলো ব্যবহার করা যায় না।

ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করা রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের পালপাড়া এলাকার শফিকুলের স্ত্রী মমতাজ (২৮) বলেন, আমি ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তার দেখাই। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হাম-রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছি বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়ন থেকে হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজন আছমা বেগম বলেন, হাসপাতালে রোগী নিয়ে এলে ট্রলি নেই। নোংরা পরিবেশ, ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। ঠিকমতো ডাক্তার দেখেন না। আমরা এখন কোথায় যাব? এখানে ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে অন্য রোগীকেও রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দায়িত্বে থাকা এক নার্স জানান, ওই দিন হাম-রুবেলায় আক্রান্ত তিনজন রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। নানজিদা নামের সাড়ে সাত মাস বয়সী এক শিশুকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছে। বর্তমানে ২০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বিষয়টি নিয়ে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নুর নেওয়াজ আহমেদ বলেন, ‘প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। আড়াইশ শয্যার হাসপাতালের জন্য ১৭৭ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন। সেখানে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১৯ জন। নাইট ডিউটি, বহির্বিভাগে ডিউটি, অপারেশনে যুক্ত থাকা ও ময়নাতদন্তের জন্য বাইরের শিফটে কাজ করার কারণে চিকিৎসকরা কোনো বিশ্রাম পান না। স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক নিয়ে টানা কাজ করা হচ্ছে। আমরা যতটা পারছি সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

এদিকে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বে থাকা কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জেলায় ডেঙ্গু এবং হাম-রুবেলা রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে। মানুষকে সচেতন করতে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।’

তিনি জানান, ক্যাম্পেইন পরবর্তী সময়ে জেলার স্থায়ী ও অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে ৫৩ হাজার ৩৭৪ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলায় সর্বমোট ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৩৭ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

নানা অভিযোগ ও বিপত্তির মধ্যে এখানে চিকিৎসাসেবা কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সরকারি এই হাসপাতালে এসে মানুষ সুস্থ হওয়ার বদলে নতুন করে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে থাকছেন। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে এই অব্যবস্থাপনা দূর করে চিকিৎসার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পদত্যাগপত্র জমা দিতে স্পিকারের কাছে যাচ্ছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

১

হাসপাতালেই ডেঙ্গুর আতঙ্ক, ময়লা-অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা

২

‘বিএনপি গণমাধ্যম কমিশন গঠনে আন্তরিক নয়’

৩

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

৪

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানে হামলা-ভাঙচুর, চার মামলায় আসামি দুই হাজার

৫

‘ডিসেম্বরে কোনো অপশক্তি অস্থিরতা করতে পারবে না’

৬

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিহত অন্তত ২২

৭

ঋণখেলাপির তালিকা থেকে সিরাজুল ইসলাম মোল্লাকে বাদ দেয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের

৮

নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা আনছে কানাডা, কারা পাবেন অগ্রাধিকার?

৯

দিনভর অনশন, মধ্যরাতে নিয়োগপত্র পেলেন ২০ প্রাথমিক শিক্ষক প্রার্থী

১০

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সসম্মানে সেই বাংলা শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিল পুলিশ: মাহদী আমিন

১১

বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ইসরায়েলি হলিউড অভিনেতা

১২