দলীয় বিবেচনায় নতুন উপাচার্য নিয়োগ

ছবি: সংগৃহীত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের (ভিসি) বড় একটি অংশ এখন পদ হারানোর আশঙ্কা করছে। এরই মধ্যে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াত ঘরানার শিক্ষকরা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের অনেকের প্রতি সরকার আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাচ্ছেন নতুন উপাচার্যরা। এর সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনসহ নানা অসংগতির অভিযোগও আছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, সরকার বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।

গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ পান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সরাসরি দলীয় পরিচয় রয়েছে। তিনি বর্তমানে বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বিএনপিসমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) বর্তমান সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক হিসেবেও নেতৃত্ব দেন। বাগেরহাট-৪ আসনে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতি করে আসছেন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি এর আগে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির দুবারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া তিনি বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম চবি শাখার সাবেক সহসভাপতি। 

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) কার্যনির্বাহী সদস্য। তিনি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। 

গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মামুন আহমেদকে ইউজিসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক আব্দুস সালাম। তিনি ঢাবির সাদা দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক। আর প্রোভিসি (প্রশাসন) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ভিসি হয়েছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রইস উদ্দিন। তিনি জবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক। 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি এই দলের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন।

এভাবে দেখা গেছে, প্রতিটি উপাচার্য পদে বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রে বিএনপির দলীয় শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ভিসি নিয়োগ-সংক্রান্ত সার্চ কমিটির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়েই আগের উপাচার্যদের সরিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৮ থেকে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যাহতি পাওয়া উপাচার্যদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিতরাও রয়েছেন। এর বেশির ভাগই জামায়াত-সমর্থিত। 

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন। বিএনপিপন্থি পরিচয় থাকার পরও ইতোমধ্যে কয়েকজন উপাচার্য পদ হারিয়েছেন। এর পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি এবং প্রশাসনিক নিয়োগে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের প্রাধান্য দেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ক্যাম্পাসে অস্থিরতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ এবং ধারাবাহিক আন্দোলন সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়া।

পদ হারানোর আতঙ্কের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপাচার্য বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমার ওপর শিবির-এনসিপি সমর্থিতদের নিয়োগ দেওয়ার চাপ ছিল। কিন্তু আমি নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখি। একজনকেও নিয়োগ দিইনি। তারপরও এখন পদ হারানোর আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।’  আরও কয়েকজন উপাচার্য তাদের পদ হারানোর আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। 

 


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মদিনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ, দায় অস্বীকার হুথিদের

১

রাজনীতিতে সংঘাতের সংস্কৃতি বন্ধ করে সমঝোতা ও সমন্বয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে

২

অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী

৩

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যেকোনো পদক্ষেপ নেবে কমিশন: ইসি সচিব

৪

স্পিকারের সঙ্গে মিষ্টির সাক্ষাৎ, পদত্যাগের প্রশ্নে বললেন ‘বিএনপির ডিসিশন যেটা হবে, সেটা হবে’

৫

৪৯তম বিসিএস • বাদপড়া ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপন সোমবার, রাজনৈতিক বৈষম্য হবে না

৬

অনুমোদিত স্থান ছাড়া সড়ক-ফুটপাতে হকার বসলেই মালামাল ক্রোক-মামলা

৭

ফেনীতে ১৫৪২ কোটি টাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

৮

হবিগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট, মহাসড়কে আটকা শতাধিক যানবাহন

৯

পদত্যাগপত্র জমা দিতে স্পিকারের কাছে যাচ্ছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

১০

হাসপাতালেই ডেঙ্গুর আতঙ্ক, ময়লা-অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা

১১

‘বিএনপি গণমাধ্যম কমিশন গঠনে আন্তরিক নয়’

১২