দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কেমন, স্থায়ী সমাধান কতো দূর?

ছবি: সংগৃহীত

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসহ (এফবিসিসিআই) ব্যবসায়ীদের ২২টি সংগঠনের নেতারা ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বললেও মূল ফোকাস ছিল জ্বালানি সংকট। দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তারা কী ধরণের সমস্যায় রয়েছেন তাই সরকারের প্রধান নির্বাহীকে জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার রাতের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশ্বাস্ত করেন। 

গেল ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাত থেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ওই ১৫ সেপ্টেম্বরই আবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তাদের ওয়েব সাইটে দেশের নিটওয়্যার পোশাক মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের’ (বিকেএমইএ) এক জরিপের চিত্র তুলে ধরে।

বিকেএমইএ’র জরিপ বলছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের নিটওয়্যার পোশাক খাতের ৭৮ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন আংশিক বন্ধ। নিটিং, ডায়িং ও গার্মেন্টস সেলাইয়ের উৎপাদন কমেছে ৩৭ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত। একই সময়ে রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমেছে ৫৫ শতাংশ কারখানার। তবে পোশাক মালিকদের আরেক সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলছে, জ্বালানি সংকটের কারণে রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে- এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। সংগঠনটি জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে কর্মঘণ্টা বাড়ছে, অর্ডার লেট শিপমেন্ট হচ্ছে ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি খরচে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কার্যালয়ে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে গত দুই মাসে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হলেও কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।

তার ভাষ্য, গত সাত দিনের তুলনায় বর্তমানে কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন কমে কারখানা বন্ধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

দেশের জ্বালানির পরিস্থিতি যখন এমন তখন এর স্থায়ী সমাধান খুবই জরুরি। কেননা বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট এখন আর কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংকট নয়, এটি ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাপনের সংকটে পরিণত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানার চাকা থেমে যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে ঘরে অন্ধকার নামে, সিএনজি স্টেশনে গাড়ির সারি দীর্ঘ হয়। আর রাতের বিদ্যুৎ চলে গেলে বইয়ের ওপর ঝুঁকে থাকা শিক্ষার্থীরা মন খারাপ করে, বিরক্ত হয়, লেখা পড়ার বারোটা বাজে।

সাম্প্রতিক হিসাবে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কমলে শুধু একটি শিল্পকারখানার চুল্লি বন্ধ হয় না, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরও চাপ পড়ে। এরই মধ্যে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং লোডশেডিং বাড়ে।

বেশ কিছু দিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় পোশাক, টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, সিরামিক, খাদ্য, ওষুধসহ নানা শিল্প উৎপাদনে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আমাদের কারোই অজানা নয় যে, শিল্পকারখানার ক্ষতি মানে সরাসরি অর্থনীতির ক্ষতি। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, যার খরচ বেশি। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, মুনাফা কমছে, রপ্তানি সময়সীমা রক্ষা কঠিন হয়।

সরকারি তথ্য বলছে, বাংলাদেশের গ্যাসের মজুদ অসীম নয়। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে আনুমানিক ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদের মধ্যে ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে অবশিষ্ট ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।

কিন্তু শুধু মাটির নিচে কত গ্যাস আছে—এই হিসাব দিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বোঝা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই গ্যাস কত দ্রুত এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে তোলা যাচ্ছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে। নতুন অনুসন্ধান ও কূপ খননে দীর্ঘদিনের ধীরগতির ফল এখন স্পষ্ট। উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অবশিষ্ট মজুদও দ্রুত কমছে। এই শূন্যতা পূরণে আমরা এলএনজির ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়েছি। কিন্তু আমদানি করা গ্যাসের বাজারে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ খুব সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নের মতো আন্তর্জাতিক ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—বিদেশ থেকে গ্যাস কিনে এনে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু একে একমাত্র ভরসা বানানো যায় না। বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহে সাম্প্রতিক বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সেই দুর্বলতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।

আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের গতি আনা। সরকার ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পরিকল্পনাটি কাগজে থাকলে চলবে না; কোন কূপ কখন খনন হবে, কত বিনিয়োগ লাগবে, কত উৎপাদন পাওয়া যাবে, এসবের সময়ভিত্তিক জবাবদিহি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানিতে শুধু স্বল্পমেয়াদি স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর না করে সরবরাহের উৎস বহুমুখী করতে হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো, ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ), পাইপলাইন, স্টোরেজ ও স্থলভিত্তিক এলএনজি সুবিধা, নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

তৃতীয়ত গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় এক জ্বালানি থেকে আরেক জ্বালানিতে ছুটে বেড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, ব্যাটারি স্টোরেজ, এসবকে জাতীয় বিদ্যুৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ 


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগ নেতার বাড়িতে ভূরিভোজের অভিযোগ, ওসি প্রত্যাহার

অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ৪ জনের দায় স্বীকার, দ্রুত তদন্ত শেষে বিচার শুরু: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ১ লাখ ডলার ফি দিতে হবে আরও ১২ মাস

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কেমন, স্থায়ী সমাধান কতো দূর?

অপ্রতিমের প্রথম জানাজা কুবিতে, দ্বিতীয় জানাজা গন্ধমতিতে সম্পন্ন

ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

অপ্রতীমের সঙ্গে সিসিটিভির সেই কিশোর পুলিশ হেফাজতে

হাম ও উপসর্গে আরো ৫ জনের মৃত্যু

জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করছে বিএনপি: শফিকুর রহমান

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি

১০

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই মিলল কুবি শিক্ষকের নিখোঁজ ছেলের মরদেহ

১১

সালমান শাহ: একজন সিনে জগতের ‘টাইম ট্রাভেলার’

১২