ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করে দেশটির বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের অর্থনীতি ‘গুঁড়িয়ে’ দিতে মিত্র দেশগুলোকেও ওয়াশিংটনের পাশে দাঁড়াতে হবে।
তার দাবি, এই অর্থনৈতিক চাপ এমন পর্যায়ে নেয়া হবে, যাতে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমে আসে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা বা অর্থনৈতিক লেনদেন চালিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেও কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা (ইরানের) এই সরকারকে পতনের দিকে নিয়ে যাব। এখন আমাদের মিত্রদের এবং বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়’। তিনি বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।’
হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ঘোষণা ট্রাম্পের, আদৌ কি তা সম্ভব?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেয়ার পর বেসেন্ট এসব মন্তব্য করলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সরকারকে সহায়তা দেয়া দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি বেসেন্ট। তিনি বলেন, ইরানের অর্থনীতির ওপর পরিকল্পিত চাপের ফলে ‘বড় পরিসরে সামরিক অভিযান’ আবার শুরু করার প্রয়োজন কমে যাবে।
ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই হামলা চালানোর কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। তবে তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আর হামলার জবাবে ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইরান।
এরপর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি অনেকটাই বন্ধ করে রেখেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে ব্যাপক ওঠানামা শুরু হয়।
এমন অবস্থায় সংঘাত বন্ধ করে আলোচনার পথ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চলতি বছরের এপ্রিলে একটি এবং পরে জুন মাসে আরেকটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে দুই দফা যুদ্ধবিরতিই বারবার ভেঙে গেছে এবং আলোচনা কার্যত থমকে আছে। এর মধ্যেই আবার সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প।
বেসেন্ট বলেন, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো হবে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমন্বিত অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা’-র অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি তাদের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান, তাদের কাছে অর্থ পাঠাতে চান কিংবা তাদের তেল কিনতে চান—তাহলে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকার আপনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করবে।’
বেসেন্ট জানান, এই পরিকল্পনার আরও বিস্তারিত আগামী ২৪ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হবে।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ হয়। সাধারণ মানুষ তাদের দুর্ভোগের জন্য সরকারকে দায়ী করে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গড়ে ৬০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। ওই সময় ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সহায়তা আসছে’ এবং একইসঙ্গে তাদের ‘বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে’ উৎসাহিত করেছিলেন।
এরপর ইরানে হামলা শুরু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে এবং আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেয়। এপ্রিল মাসে তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন করে এক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ ততদিনে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সামরিক অভিযান চালিয়ে ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানের সরকারকে উৎখাত করা বা দেশটিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হবে না।
এরপর জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) বলা হয়েছিল, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ‘সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে’।
অবশ্য ইরানের জন্য নিষেধাজ্ঞা নতুন কোনও বিষয় নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের সময় দেশটির ওপর প্রথম দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এরপর আরও বহু নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এতে ইরানের সরকার পতন হয়নি। বরং বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। চলতি বছরের শুরুতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নও চালিয়েছে সরকার।
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরান নতুন করে দেয়া অর্থনৈতিক চাপও সামলে উঠতে পারবে। তিনি বলেন, ‘শুরুতে এর কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরান এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে না।’
আরেক বাসিন্দাও মনে করেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরানের সরকারের স্থায়িত্বে বড় প্রভাব ফেলবে না। তিনি ‘মিডল ইস্ট লাইফলাইন’-কে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের কারণে সবকিছু বদলে যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে এবং মানুষও এই পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমি নিশ্চিত, ইরান বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার অন্য পথ খুঁজে নেবে।’
তার ভাষায়, ‘অবশ্যই কিছুটা প্রভাব পড়বে এবং অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।’