ইতিহাস হতে যাচ্ছে টরন্টোতে। বিশ্বকাপে এক ম্যাচে চল্লিশোর্ধ্ব দুজনকে কখনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টায় এ নজির আর থাকছে না। আধুনিক ফুটবলের দুই হেভিওয়েট ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মডরিচ পরস্পরের মুখোমুখি হচ্ছেন। চল্লিশোর্ধ্ব দুই ফুটবলার শেষ বিশ্বকাপে ট্রফি জয়ের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চির তরুণ দুই তারকার জন্য নকআউটের ‘শেষ ৩২’-এ পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচটি গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এখান থেকে কোন বুড়ো শেষ ষোলোতে নাম লেখাবেন?
আক্ষেপের ব্যাপার হলো, দুই বর্ষীয়ান তারকার কেউই এখন ফর্মে নেই। চলতি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে তাদের খেলা দেখে অনেকেই দলের বোঝা বলে মন্তব্য করেছেন। ভুলে যাচ্ছেন জাতীয় দলে তাদের বিশাল অবদানের কথা। এবারের আসরের আগে চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলার হিসেবে (গোলরক্ষক ছাড়া) বিশ্বকাপ খেলেছেন কেবল ক্যামেরুনের রজার মিলা। ৪২ বছর বয়সে নব্বইয়ের বিশ্বকাপে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। রোনালদো-মডরিচ কি পারবেন সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে?
এ দুই বুড়ো আবার পুরোনো বন্ধু। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো ও ৪০ বছরের মডরিচ দীর্ঘদিন একসঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদে খেলেছেন। রিয়ালে ছয় মৌসুম একসঙ্গে খেলে তারা চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে রোনালদো ইতালি, ইংল্যান্ড ঘুরে এখন সৌদি আবরের আল-নাসরে খেলছেন। মডরিচ রিয়াল থেকে গত মৌসুমে ইতালির এসি মিলানে নাম লিখিয়েছেন। হয়তো খুব বেশিদিন তারা ফুটবল খেলবেন না। এর আগে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার আসরটা স্মরণীয় করে রাখতে চান তারা। আর শেষ বেলায় যদি বিশ্বকাপ জিততে পারেন, তাহলে এর চেয়ে গৌরবের বিদায় আর কী হতে পারে!
রোনালদো অবশ্য উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ‘আই অ্যাম ব্যাক’ চিৎকারে সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন। ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবল হিসেবে রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। তবে ওই একটি ম্যাচ বাদে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কঙ্গোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তিনি ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। এরপর কলম্বিয়ার বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচেও তিনি ছিলেন নিজের ছায়া। প্রতিপক্ষের পোস্ট লক্ষ্য করে কেবল একটি শট নিতে পেরেছিলেন তিনি। এরপরই কড়া সমালোচনা ধেয়ে আসতে থাকে তাঁর দিকে। তিনি অবশ্য এসব সমালোচনায় অভ্যস্ত। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এসব নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘২৩ বছর ধরে পেশাদার ফুটবলে আছি। যখনই সময়টা একটু খারাপ যায়, তখনই চারদিক রব ওঠে যায়– ক্রিশ্চিয়ানো শেষ! সে বুড়িয়ে গেছে।’ এসব তাঁর কাছে নতুন নয়।
রোনালদো চলতি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচই পূর্ণ সময় খেলেছেন। বাজে খেলার পরও কোনো ম্যাচে তাঁকে বদল করার সাহস দেখাননি কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। পাঁচবার ব্যালন ডি’অরজয়ী এ তারকাকে বদল না করার প্রসঙ্গে কোচ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ‘ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা খেলোয়াড়টিকে তো আমি বসিয়ে রাখতে পারি না, যখন আমাদের গোল করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর শারীরিক ও মানসিকভাবে ৯০ মিনিট খেলতে রোনালদোর কোনো সমস্যা হয় না।’ অথচ চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে ১-০ গোলে হারের দিনই রোনালদোর শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকে।
৪০ বছর বয়সী মডরিচের অবস্থাও রোনালদোর মতো হয়ে গেছে। যে মানুষটি পুরো মাঠ চষে বেড়াতেন, বিশ্ব ফুটবলের সেরা মিডফিল্ডারের মর্যাদা দেওয়া হতো, সেই মডরিচকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে খুঁজেই পাওয়া গেল না। ইংলিশ উইঙ্গার ননি মাদুয়েকের সঙ্গে গতিতে কুলিয়ে উঠতে না পেরে বক্সের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি, রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়েছিলেন। বাজে খেলার জন্য ওই ম্যাচে বিরতির পরই মডরিচকে তুলে নিয়েছিলেন কোচ। ক্রোয়েশিয়াও সে ম্যাচে ৪-২ গোলে পরাজিত হয়েছিল। পরেরটি ছিল মরডিচের ২০০তম ম্যাচ। পানামাকে ১-০ গোলে হারিয়ে সে উপলক্ষটা স্মরণীয় করে রেখেছিল ক্রোয়েশিয়া। মডরিচ হলেন ২০০ ম্যাচ খেলা চতুর্থ ফুটবলার। শেষ গ্রুপ ম্যাচে ঘানার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন মডরিচ। ক্রোয়েশিয়ার ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল ও গত আসরে সেমিতে খেলার মূল কারিগর ছিলেন মডরিচ। এবার কি সে সাফল্য ছাড়িয়ে যেতে পারবেন তিনি!