বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই সরু জলপথ দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের দিকে যাতায়াত করত। কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ কোনো একক দেশের অনুমতি বা ট্রানজিট ফি ছাড়াই এই পথ ব্যবহার করে আসছে।
তবে এই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়, ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নতুন একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে তাদের সমঝোতা হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক সূত্রগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর ইরানের নজরদারি বাড়তে পারে।
ইরান ও ওমান কী বিষয়ে একমত হয়েছে?
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেয়ি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথের ভৌগোলিক সীমা বা স্থানাঙ্ক নির্ধারণে তেহরান ও মাসকাট একমত হয়েছে। এখন সমঝোতার মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি চূড়ান্ত করছে দুই দেশ।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি আলোচনাকে ‘মৌলিক সমঝোতায়’ পৌঁছেছে বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই অগ্রগতি চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।’
ইরান আরও বলেছে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো তাদের যাত্রাপথের প্রবেশ ও প্রস্থান উভয় অংশেই ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে পারে।
জাহাজ চলাচলে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় জাহাজগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নৌপথ ব্যবহার করে। এজন্য ইরান বা ওমানের কাছ থেকে আলাদা অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয় না। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে এই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ ইরানের নিয়ন্ত্রিত জলসীমা দিয়ে চলাচল করবে। এর ফলে উপসাগরমুখী সামুদ্রিক যান চলাচলের ওপর তেহরানের নজরদারি কার্যত বেড়ে যাবে। তবে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের ক্ষেত্রেও ইরান একই মাত্রার কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে কি না, সেটি এখনো আলোচনার বিষয়।
ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল পরিচালনার জন্য ইরান ও ওমান একটি ‘নতুন মডেল’ নিয়ে কাজ করছে। প্রস্তাবিত নৌপথের বেশির ভাগ অংশ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে এবং অপেক্ষাকৃত ছোট অংশ থাকবে ওমানের জলসীমায়।
ইরানের লারাক দ্বীপের কাছের উত্তরাঞ্চলীয় পথ এবং ওমানের জলসীমা দিয়ে যাওয়া দক্ষিণাঞ্চলীয় বর্তমান অস্থায়ী নৌপথগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে নতুন করিডোর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নতুন নৌপথটি দুই থেকে চার মাস চালু রাখা হতে পারে। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী এর মেয়াদ আরও বাড়তে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সমঝোতা?
হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে কোনো দেশের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তার বড় ধরনের কৌশলগত প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা বাড়ার আগে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো ট্রানজিট ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। নতুন ব্যবস্থায় ইরান যদি উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরানের অন্যতম বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত অর্জন হতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
জাহাজে তল্লাশি চালাবে কে?
এখনো এই প্রশ্নের সমাধান হয়নি। রয়টার্সকে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো চায় জাহাজে তল্লাশি বা পরিদর্শনের দায়িত্ব আঞ্চলিক তত্ত্বাবধানে থাকুক, কেবল ইরানের হাতে না থাকুক। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য কোনো অর্থ দিতে হবে কি না, সেটি নিয়েও আলোচনা চলছে।
ইরান জাহাজের বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ট্রানজিট ফি চাচ্ছে। অন্যদিকে ওমান প্রায় ৩ শতাংশ হারে তুলনামূলক কম ফি নিয়ে আলোচনা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, কোনো ট্রানজিট ফি ছাড়াই জাহাজগুলো আগের মতো জলপথটি ব্যবহার করুক।
সমঝোতার একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে অর্থ প্রদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐচ্ছিক রাখা। তবে বিলম্ব বা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে অনেক জাহাজ কোম্পানি শেষ পর্যন্ত অর্থ দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখনও চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়নি কেন?
তেহরান সমঝোতার অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী হলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনা নিয়ে অনেক বিষয় এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। ইরানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘বিষয়টি বিস্তারিত শর্তের ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্পের একটি পোস্টও পুরো সমঝোতাকে ভেস্তে দিতে পারে।’
ইরানি কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন জুনের মাঝামাঝি সময়ে করা সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে। ঘারিবাবাদি বলেন, ইরান এমন বার্তা পেয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে চলতে প্রস্তুত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা কাছাকাছি। ফক্স নিউজকে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, আলোচনা ‘ভালোভাবেই এগোচ্ছে’ এবং সর্বশেষ আলোচনা ছিল ‘সারাদিনের আলোচনা’।
হরমুজ প্রণালি ‘খুব শিগগিরই’ খুলে যাবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি। এর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, আলোচনা এগিয়ে যাওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা তিনি স্থগিত করেছেন।
হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আশাবাদী বক্তব্য তার আগের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা ভিন্ন। জুলাইয়ের শুরুতে তিনি হরমুজ প্রণা