ঈদুল আজহার প্রধান জামাতে অংশ নিতে ভোর থেকেই রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে মুসল্লিদের ঢল নামে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্ট সংলগ্ন পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে দলে দলে মুসল্লিরা জাতীয় ঈদগাহে প্রবেশ করেন। সকাল সাড়ে সাতটায় এখানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে দেশের প্রধান ঈদ জামাত।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ভোর থেকেই পল্টন মোড়, মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট এলাকা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রান্তে মুসল্লিদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। নির্ধারিত গেট দিয়ে ধীরে ধীরে সবাইকে মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখেন। প্রধান ফটকে আর্চওয়ের মাধ্যমে তল্লাশি করে মুসল্লিদের ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়।
ঈদের নামাজ আদায়কে ঘিরে জাতীয় ঈদগাহ এলাকায় ছিল ভিন্ন এক আবহ। অনেকের গায়ে নতুন পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি। কেউ হাতে জায়নামাজ, কেউ আবার পানির বোতল ও ছাতা নিয়ে এসেছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা থাকায় অনেকে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে আসেন। সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা যেন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের জামাতে অংশ নিতে এসে তাদের মধ্যে দেখা যায় বাড়তি উচ্ছ্বাস। মাঠে প্রবেশের সময় বাবা-মায়ের হাত ধরে ছোট ছোট শিশুদের হাসিমুখ উৎসবের আমেজ আরও বাড়িয়ে তোলে।
জাতীয় ঈদগাহের প্রধান জামাতে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। পাশাপাশি রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, বিচারপতি, বুদ্ধিজীবী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও জামাতে শরিক হবেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, মুসল্লিদের স্বস্তিতে নামাজ আদায়ের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩৩ হাজার বর্গমিটার আয়তনের জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের মধ্যে মূল প্যান্ডেলের আয়তন ২৫ হাজার ৪০০ বর্গমিটার। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আশপাশের সড়কেও নামাজ আদায় করা যাবে।
এবার জাতীয় ঈদগাহে ১২১টি কাতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা কাতার। সেখানে প্রায় ২৫০ জন পুরুষ ও ৮০ জন নারীর নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণ মুসল্লিদের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার পুরুষ ও সাড়ে তিন হাজার নারীর জায়গা। নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ ও নামাজের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিশাল এই আয়োজন সফল করতে ব্যাপক অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্যান্ডেলের কাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ৪৩ হাজারের বেশি বাঁশ ও ১৫ টনের বেশি রশি। বৃষ্টি থেকে সুরক্ষায় টাঙানো হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি উন্নতমানের ত্রিপল। পুরো মাঠ আলোকিত রাখতে বসানো হয়েছে ৯০০টি টিউবলাইট।
গরমের কথা বিবেচনায় প্যান্ডেলের ভেতরে রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০টির বেশি ফ্যান। অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশে রাখা হয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও। পুরো মাঠে কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাই মুসল্লিদের জায়নামাজ না আনতেও অনুরোধ করা হয়েছিল।
ঈদগাহে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মুসল্লিদের প্রবেশের জন্য চারটি ফটক এবং নামাজ শেষে নির্বিঘ্নে বের হওয়ার জন্য সাতটি বহির্গমন পথ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ পুরুষ, নারী ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা আলাদা পথ রাখা হয়েছে।
অজুর জন্যও রাখা হয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। একসঙ্গে প্রায় ১৪০ জন অজু করতে পারবেন। এর মধ্যে ১১৩ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারীর জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার, সুপেয় পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং সিসিটিভি নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, মুসল্লিদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টি হলে জাতীয় ঈদগাহের পরিবর্তে প্রধান জামাত জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হবে।