বিএনপি সরকারের ১০০ দিনের মধ্যে শিক্ষা খাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নীতিগত পরিবর্তন এসেছে। স্কুলে আবার ভর্তি পরীক্ষা ও প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালু, পাবলিক পরীক্ষা এগিয়ে আনা, মাধ্যমিক স্তরে তিনটি নতুন বিষয় সংযোজন, পাঠ্যবই পরিমার্জন, ডিজিটাল নকল ঠেকাতে পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক পদায়ন সমালোচনাকে উস্কে দিয়েছে। বিতর্কিত অনেক সিদ্ধান্তে সমালোচনার পাল্লাই ভারী।
সরকারের দাবি, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদের একাংশের মত, দ্রুত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাস্তবায়ন কাঠামো ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হলো ২৭ মে।
নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ‘ন্যায্য, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই শিক্ষা খাতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এর আগে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখায়ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
স্কুলে আবার ভর্তি পরীক্ষা চালু
করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব ভর্তি লটারির মাধ্যমে শুরু হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় গত ১৭ মার্চ স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অভিভাবকের একটি অংশের আশঙ্কা, ভর্তি পরীক্ষা শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি কোচিং-নির্ভরতা আবারও বেড়ে যেতে পারে।
১৬ বছর পর ফিরল প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা
প্রাথমিক স্তরে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বৃত্তি পরীক্ষা আবার চালুর সিদ্ধান্তকে সরকারের বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ১৫ এপ্রিল এ পরীক্ষা শুরু হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি এবং মেধাবীদের আলাদা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এগিয়ে আনা হলো এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা
পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা আগের তুলনায় এগিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ফল প্রকাশের সময়ও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এসএসসি ও এইচএসসির ফল প্রকাশের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সময় আরও কমিয়ে দ্রুত ফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সবকিছু যখন আধুনিক ও দ্রুত হচ্ছে, তখন ফল প্রকাশের সময়ও কমিয়ে আনা হবে।
নতুন শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে তিন বিষয়
আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে তিনটি নতুন বিষয় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যদিও বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনও প্রকাশ করা হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, যুগোপযোগী দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল নকল ঠেকাতে আইন সংশোধন
পাবলিক পরীক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি ও ডিজিটাল নকল প্রতিরোধে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, ব্লুটুথ ডিভাইস ব্যবহার এবং ডিজিটাল প্রতারণা ঠেকাতে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।
২২ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ২২টি পাবলিক (সরকারি) বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উচ্চ শিক্ষা খাতে প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতেই দ্রুত এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট পুনর্গঠন
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষাপটে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এতে আর্থিক অনিয়ম কমবে এবং শিক্ষকরা দ্রুত সুবিধা পাবেন।
খোলা থাকবে স্কুলের মাঠ
শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকারি স্কুলের মাঠ স্থানীয় শিক্ষার্থী ও শিশুদের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সোলার প্যানেল স্থাপন
দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে সোলার প্যানেল স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষা খাতে কোনো ধরনের কার্পণ্য করবে না সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দুই হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে এবং পরিবেশবান্ধব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।
মিড-ডে মিল নিয়ে সমালোচনা
সরকারের কিছু কর্মসূচি নিয়ে সমালোচনাও চলছে। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পচা বা কাঁচা কলা, নিম্নমানের বানরুটি ও নষ্ট ডিম সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্তের আশ্বাস দিলেও শিক্ষাবিদরা একে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন।
প্রশাসনিক পদায়নে বিতর্ক
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) অধ্যাপক খান মই