আগের মতোই খাচ্ছেন, খুব একটা বদলায়নি জীবনযাপনও। তারপরও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেন নীরবে ওজন বাড়ছে। সিঁড়ি ভাঙতে হাঁপ ধরছে, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে। অনেকেই তখন মনে করেন হয়তো বয়স বাড়ছে তাই এমন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩৫ বছরের পর হঠাৎ ওজন বাড়াকে একেবারে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। অনেক সময় এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে থাইরয়েডের সমস্যা, বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজম।
থাইরয়েড: গলার সামনের দিকে থাকা ছোট্ট প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করে এটি। যখন থাইরয়েড ঠিকভাবে কাজ করে না, তখন শরীরের মেটাবলিজম ধীর হতে শুরু করে। ফলে শরীর আগের মতো ক্যালরি খরচ করতে পারে না। এর ফলেই ধীরে ধীরে বাড়তে পারে ওজন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কিছু পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। ঘুম কম হওয়া, স্ট্রেস, কম শারীরিক পরিশ্রম কিংবা হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও ওজন বাড়তে পারে। তবে যদি খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই দ্রুত ওজন বাড়তে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে শরীরের ক্যালরি ব্যবহারের হার কমে যায়। ফলে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে। অনেক সময় শরীরে পানি জমা বা ফোলাভাবও দেখা দেয়। ৩৫ বছর বয়সের পরে, হরমোনের পরিবর্তন, গর্ভাবস্থা বা অটোইমিউন রোগের কারণে মহিলাদের থাইরয়েডের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে, শুধুমাত্র মহিলারাই ওজনের পরিবর্তন অনুভব করেন না, পুরুষদেরও থাইরয়েডের পরিবর্তন হতে পারে।
থাইরয়েডের লক্ষণ: শুধু ওজন বাড়া মানেই থাইরয়েডের সমস্যা নয়। তবে এর সঙ্গে আরও কিছু লক্ষণ থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি। যেমন—
সবসময় ক্লান্ত লাগা
অস্বাভাবিক ঠান্ডা অনুভব করা
চুল পড়া ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
কোষ্ঠকাঠিন্য
মুখ বা গলায় ফোলাভাব
মন খারাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্নতা
নারীদের অনিয়মিত মাসিক
ডায়েট ও ব্যায়াম করেও ওজন না কমা
সমস্যা হলো, এই লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে দেখা দেয়। তাই অনেকেই বিষয়গুলোকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে অবহেলা করেন।
দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি
ভালো খবর হলো, থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত করা খুব কঠিন নয়। সাধারণ একটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা জানা যায়। সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে ওষুধ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন থাইরয়েডের সমস্যা অবহেলা করলে উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদরোগ, বন্ধ্যাত্ব ও অতিরিক্ত দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিলেই যে সব শেষ বিষয়টা এমন নয়। বরং থাইরয়েড হোক বা না হোক সুস্থ জীবনযাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো এবং সুষম খাদ্য শরীরের হরমোন ও মেটাবলিজম ঠিক রাখতে সাহায্য করে বলছেন চিকিৎসকরা।
তবে এই ডিজিটাল যুগে অনেকেই লক্ষণ দেখে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেন। আর এটা অনেকসময় বিপজ্জনক হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে ওজন বাড়া বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। বয়স বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু শরীর যদি বারবার জানান দেয় কিছু একটা ঠিক নেই, তাহলে সেটিকে অবহেলা না করাই ভালো। কারণ কখনও কখনও আপনার বাড়তে থাকা ওজনই হতে পারে শরীরের নীরব সতর্কবার্তা।