যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) দেশটির আনসার ও দেইর আল-জাহরানি এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু ও দুই নারী রয়েছেন। এছাড়া নিহতদের মধ্যে সাতজন একই পরিবারের বলে জানা গেছে। খবর বিবিসি
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজধানী বৈরুত থেকে ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে আনসার শহরের উপকণ্ঠে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে তিন শিশু ও দুই নারী রয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার পর ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর এক কমান্ডারকে হত্যা করা হয়েছে। আইডিএফ আরও দাবি করেছে, ওই কমান্ডারের পরিবারের সদস্যদের তিনি ‘মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন’ এবং তারাও হামলায় আহত হয়েছেন।
পরে শনিবার দেইর আল-জাহরানি শহরে আরও কয়েক দফা হামলা চালানো হয়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে চারজন নিহত ও আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন।
লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানায়, স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আনসারে হামলাটি চালানো হয়। ওই এলাকায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বসবাস করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাইরেনের শব্দের মধ্যে গ্রামের রাস্তাগুলো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, নিহত সাতজন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন, সেখানে কোনও ‘সামরিক অবকাঠামো’ ছিল না। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলকে এই উত্তেজনা বাড়ানো বন্ধ করতে হবে। আমাদের জনগণের নিরাপত্তা এবং নিজেদের ভূখণ্ডে বেঁচে থাকার অধিকার কোনও আলোচনা বা দর-কষাকষির বিষয় নয়।’
এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলা হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা দেখা যায় এমন কৌশলগত উঁচু এই স্থানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই যুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি লড়াই হয়েছে।
পরে আইডিএফ এক বিবৃতিতে জানায়, হিজবুল্লাহর রাদওয়ান ফোর্সের একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার আলি সামির আল-হাজ হাসান হামলায় নিহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছেন। তারাও আইডিএফ সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতিতে জড়িত ছিলেন।
আইডিএফ দাবি করেছে, হামলাটি নির্দিষ্টভাবে হাসানকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তিনি বৈধ লক্ষ্য ছিলেন। তার পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি বলেও দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের ভাষ্য, হাসান সামরিক সদর দপ্তরের ভেতরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন এবং তাদের ‘মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিলেন’।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ও আইডিএফের হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, হিজবুল্লাহর হামলায় তিন ইসরায়েলি সেনা গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এর জবাবে হামলা চালিয়ে ‘হামলার নির্দেশ দেয়া হিজবুল্লাহর সন্ত্রাসী সদর দপ্তর’ ধ্বংস করা হয়েছে।
হিজবুল্লাহ অবশ্য নেতানিয়াহুর এই দাবিকে ‘মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। গোষ্ঠীটি বলেছে, লেবাননের বেসামরিক নাগরিকদের তাদের বাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হামলায় অনেকের মরদেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে বলেও দাবি করেছে তারা। পরে ওই স্থানগুলোকে সামরিক স্থাপনা বলে দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করে হিজবুল্লাহ।
গত ২ মার্চ ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধে লেবানন জড়িয়ে পড়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ে।
এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশে স্থল অভিযান চালায়। ইসরায়েলি বাহিনী এখনও লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে।